“মুর্শিদাবাদে কি এখনও টিএমসি-র সরকার চলছে?” শুভেন্দুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তোপ

কলকাতা: অষ্টাদশ বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে রাজ্যপালের ভাষণের ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে কার্যত নজিরবিহীনভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠল সদন। শাসক বেঞ্চের তুমুল বাধা, চিৎকার এবং পাল্টা চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে রাজ্য সরকারকে তীব্র হুঁশিয়ারি দিলেন মুর্শিদাবাদের হেভিওয়েট তথা আম জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান বিধায়ক হুমায়ুন কবির।

একদিকে মুর্শিদাবাদ জেলায় দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল প্রধানদের আড়াল করার প্রশাসনিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, অন্যদিকে মাইনরিটি (সংখ্যালঘু) ইস্যুতে সজল ঘোষ ও কৌস্তভ বাগচীদের সরাসরি নিশানা করে বিধানসভা কক্ষেই বেনজির বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়লেন তিনি। স্পিকারের বারবার শান্ত হওয়ার অনুরোধ সত্ত্বেও শাসক ও বিরোধী বেঞ্চের উত্তেজনায় বিঘ্নিত হয় সদনের পবিত্রতা।

 “সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার দেখাবেন না, আপনাদের চেয়ে বিরোধীদের ভোট বেশি!”

বক্তব্যের শুরুতেই বর্তমান শাসক দলের (বিজেপি) আসন সংখ্যা এবং অহংকার নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন হুমায়ুন কবির। শাসক বেঞ্চের দিকে আঙুল তুলে তিনি মনে করিয়ে দেন ২০২১ সালের ১৭তম বিধানসভায় আজকের শাসক দলই মাত্র ৭৭টি আসন নিয়ে বিরোধী বেঞ্চে বসেছিল, যা পরে নানা কৌশলে কমিয়ে ৬৫-তে নামিয়ে আনা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের যেন সেই অহংকার না হয়। বর্তমানে শাসক দলের শক্তি ২০৮ হলেও, বিরোধী বেঞ্চে ৮৬ জন সদস্য আছেন। হুমায়ুন বাবু মনে করিয়ে দেন, আপনারা ২ কোটি ৯৩ লক্ষ ৬০ হাজার ভোট পেয়ে সরকারে এসেছেন ঠিকই, কিন্তু সব মেলালে বিরোধীদের মোট ভোট ৩ কোটি ২২ লক্ষ! এটা স্মরণ রেখে সদনে কথা বলবেন।”

 মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক গোলকধাঁধা: “জেলায় কি এখনও টিএমসি-র সরকার চলছে?”

মুর্শিদাবাদ জেলার ২২টি আসনের অদ্ভুত রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও পরিষদীয় মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন হুমায়ুন কবির। তিনি প্রশ্ন তোলেন, জেলায় আসলে কার প্রশাসন চলছে?

“২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি মুর্শিদাবাদে মাত্র ২টি আসন (মুর্শিদাবাদ ও বহরমপুর) জিতেছিল। এবার পদ্মফুল চিহ্ন নিয়ে ৮ জন বিধায়ক এসেছেন। বাকি ৮ জন কোন টিএমসি—পুরনো না নতুন, তা বোঝা যাচ্ছে না! বিধানসভার ভেতরে ২২ জনের মধ্যে একদিকে ১৬ জন আর আমরা একদিকে ৬ জন হয়ে গেছি। অত্যন্ত গোলমেলে পরিস্থিতি।”

পঞ্চায়েতের দুর্নীতিগ্রস্তদের বাঁচাতে প্রশাসনিক তৎপরতার অভিযোগ

হুমায়ুন কবির অভিযোগ করেন, আরবান ডিপার্টমেন্টের অধীনে থাকা বহরমপুর, কান্দি, বেলডাঙার মতো পৌরসভাগুলি যখন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে এবং চেয়ারম্যানরা ইস্তফা দিচ্ছেন, তখন গ্রামীণ পঞ্চায়েতে সম্পূর্ণ উল্টো ছবি।

তিনি দাবি করেন, নওদা এবং বেলডাঙা-২ ব্লকে পঞ্চায়েত রুলস মেনে তৃণমূলের দুর্নীতিগ্রস্ত প্রধান ও পঞ্চায়েত সমিতির বিরুদ্ধে যখনই ‘রিমুভাল নোটিস’ (অপসারণের নোটিশ) দেওয়া হচ্ছে, জেলা প্রশাসন তা গায়েব করে দিচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলার অজুহাত দেখিয়ে ২ জুনের বেলডাঙার মিটিং এবং ২৪ জুনের নওদা পঞ্চায়েত সমিতির অনাস্থা বৈঠক অজ্ঞাত কারণে স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি করেন।

 মাইনরিটি ইস্যুতে সজল ঘোষের সঙ্গে তীব্র সংঘাত: “ধমকানোর অধিকার আপনাদের নেই!”

সদনে বক্তব্য রাখার সময় সজল ঘোষের একটি মন্তব্যের সূত্র ধরে সংখ্যালঘু বা মাইনরিটি ইস্যুতে সুর চড়ান হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, মাইনরিটি মানেই শুধু মুসলিম নয়, এর মধ্যে অনেক সনাতনী ধর্মের মানুষও আছেন। আপনারা যেভাবে একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করছেন, তা হাউসের ভেতরে বলা যায় না।” তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন, মুর্শিদাবাদে কটা হিন্দু সংখ্যালঘু পরিবার আক্রান্ত হয়েছে, তা পরিসংখ্যান দিয়ে শাসক দল প্রমাণ করুক।

এই মন্তব্যের পরই শাসক বেঞ্চের বিধায়ক সজল ঘোষ ও অন্যান্যরা তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেন এবং হুমায়ুন কবিরকে থামানোর চেষ্টা করেন। তখনই পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে স্পিকার চিৎকার করে বলেন, মাননীয় সদস্যরা শান্ত থাকুন, বক্তব্য রাখতে দিন। এতে সদনের পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে।” হুমায়ুন কবির অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে শাসক দলকে উদ্দেশ্য করে শেষ হুঁশিয়ারি দেন, আপনাদের কেউ অধিকার দেয়নি এইভাবে ধমকানোর! অতীতে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এসে আমাকে ডাইরেক্ট আক্রমণ করেছিলেন, আমি তার পাল্টা জবাব দিয়েছিলাম। কিন্তু সদনের ভেতরে আমি কোনোদিন কারো অসম্মান করিনি, বাইরেও করব না। তবে ধমকালে ছেড়ে কথা বলব না।”

বিরোধী আসনে বসেও রাজ্যপালের ভাষণকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে এবং আগামী দিনেও রাজনৈতিক সততার পক্ষে লড়াইয়ের বার্তা দিয়ে নিজের বক্তব্য শেষ করেন মুর্শিদাবাদের এই লড়াকু বিধায়ক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *