মুর্শিদাবাদ: বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিবৃতির পরই মুর্শিদাবাদ জেলা রাজনীতিতে পুলিশ ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবিরের সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। হুমায়ুন কবিরের অনুগামীদের গ্রেফতার এবং তাঁর বাড়িতে আইনি নোটিশ পাঠানোর পর, এবার শক্তিপুর থানার ওসি অতনু দাসের বিরুদ্ধে বেনজির দুর্নীতি, তোলাবাজি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে সরব হলেন এই দাপুটে নেতা। ওসির বিরুদ্ধে ভিজিল্যান্স এবং অ্যান্টি-করাপশন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ওসির বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকা ও সোনার বাট আত্মসাতের মারাত্মক অভিযোগ
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হুমায়ুন কবির শক্তিপুর থানার বর্তমান ওসি অতনু দাসের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক সব অভিযোগ এনেছেন। তাঁর বক্তব্য ওসি যখন লালগোলা থানায় কর্মরত ছিলেন, তখন সাধারণ মানুষকে থানায় না নিয়ে গিয়ে অন্য গোপন জায়গায় আটকে রেখে থার্ড ডিগ্রি টর্চার করা হতো। সেখানে কারও কাছ থেকে ৫ লাখ, কারও থেকে ১০ লাখ বা ২৫ লাখ টাকা করে গত দু’বছরে মোট ৫০ কোটি টাকা এবং ১০০ গ্রামের প্রায় ৫০টি সোনার বাট তোলা হয়েছে।
শক্তিপুরে পোস্টিং পাওয়ার পর ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিএলআরও (BLRO)-কে না জানিয়ে, কোনও রয়্যালটি জমা না দিয়ে প্রায় ৭০ লক্ষ টাকার মাটি কেটে ভাটায় বিক্রি করেছেন ওসি। পরে নিজের পিঠ বাঁচাতে ১৯শে মার্চ নিজেই একটি সুয়োমোটো (Suo-motu) কেস রুজু করেন।
“১ লক্ষ টাকার মাছ লুট করেছে পুলিশ!” খোদ হুমায়ুনের মৎস্য খামারে হানা
হুমায়ুন কবির অভিযোগ করেন, আজ (২ জুলাই) ভোর ৫টায় প্রায় ১০০ জন পুলিশ কর্মী এবং ৫০ জন সিআরপিএফ (CRPF) জোয়ান নিয়ে শক্তিপুর থানার ওসি তাঁর মৎস্য খামারে হানা দেন।
“২০৩২-৩৩ সাল পর্যন্ত এই মৎস্য খামারের বৈধ লিজ (Agreement) রয়েছে আমাদের নামে। আমার ভাইপো রাজা এটি দেখাশোনা করে। আজকে সকালে ওসি অতনু দাস নিজের লোক লাগিয়ে খামারের ডেগ থেকে প্রায় ১ লক্ষ টাকার রুই ও কাতলা মাছ জোরপূর্বক কেড়ে নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন। এটা কি কোনও প্রশাসন, নাকি ওসির গুন্ডামি?”
তার দাবি, শুধু মৎস্য খামারে হানাই নয়, তাঁর দলীয় কর্মীদের ওপরও মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার চালাচ্ছে পুলিশ। ১ জুলাই রাতে কাজীপুরার আম জনতা উন্নয়ন পার্টির কর্মী কাজল শেখের বাড়িতে গিয়ে পুলিশ তাঁর মা, বাবা ও স্ত্রীর সামনে চরম গালিগালাজ করে। হুমায়ুন কবিরের প্রাক্তন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মী বান্টু শেখকে রাত্রি ১২টার সময় গিয়ে ওসি হুমকি দেন, “তুই বাউন্সার হয়েছিস? হুমায়ুন কবিরের ধারেকাছে যদি তোকে দেখি, তবে তুলে এনে উল্টো করে টাঙাবো।”
পুলিশি নোটিশ এবং হাজিরা প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির তাঁর আগামী পদক্ষেপ স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি জানান, শক্তিপুর থানায় ৩রা জুলাই এবং রেজিনগর থানায় ৪ঠা জুলাই তাঁকে তলব করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আগামী ৩রা জুলাই (শুক্রবার) শক্তিপুর থানায় আমি হাজির হতে পারব না, কারণ ওই সময়ে আমার জুম্মার নামাজ রয়েছে। তবে আগামী ৪ঠা জুলাই রেজিনগর থানায় যে দুটি সুমোটো কেস রয়েছে, তার তদন্তে আমি নিশ্চিতভাবেই হাজিরা দেব।” ইতিমধ্যেই তাঁর দলের কর্মী আনিসুর রহমানকে ৭ দিনের পুলিশি হেফাজতে (PC) নিয়েছে শক্তিপুর থানা এবং গোলাম মোস্তফা ও আমিনুলকে ৫ দিনের হেফাজতে নিয়েছে রেজিনগর থানা।
মুখ্যমন্ত্রীর ‘সুশাসন’ ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে তীব্র কটাক্ষ করে হুমায়ুন কবির বলেন, বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী গুন্ডাদমনের কথা বলছেন, অথচ তাঁর পুলিশই আমজনতার ওপর গুন্ডামি করছে।
তিনি জোর গলায় দাবি জানান, “যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি ধরার জন্য ইডি, সিবিআই, এনআইএ তদন্ত হচ্ছে, ঠিক তেমনই ওসি অতনু দাসের পার্সোনাল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং গত আড়াই বছরের সম্পত্তি খতিয়ে দেখতে ভিজিল্যান্স ও অ্যান্টি-করাপশন উইং-এর তদন্ত হওয়া উচিত।” ওসির এই জুলুমের বিচার আগামী ২০২৯ সালের নির্বাচনে বাংলার মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে দেবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।