মুর্শিদাবাদ: খৈতান সংস্থার জমির লিজ, সেখানে থাকা মাছ ও অন্যান্য সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান তথা নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। তাঁর দাবি, খৈতানের সঙ্গে তাঁর লিজের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়নি। বরং ২০২৩ সালে নতুন করে ১০ বছরের জন্য চুক্তি করা হয়েছে, যার মেয়াদ ২০৩৩ সাল পর্যন্ত। একই সঙ্গে শক্তিপুর থানার ওসির বিরুদ্ধে দলীয় কর্মীদের বাড়িতে গিয়ে হুমকি ও গালিগালাজের অভিযোগ তুলে আগামী দিনে থানা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
খৈতানের সঙ্গে তাঁর লিজের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার দাবি প্রসঙ্গে হুমায়ুন বলেন, কে কী মন্তব্য করেছেন, তার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন তিনি মনে করেন না। তাঁর দাবি, প্রথম পর্যায়ে ১১ বছরের লিজ ছিল। সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২৩ সালে খৈতানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লেটারহেডে আরও ১০ বছরের জন্য চুক্তি করা হয়। সেই অনুযায়ী ২০৩৩ সাল পর্যন্ত লিজ কার্যকর থাকার কথা এবং বছরে ৭ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার শর্ত রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
হুমায়ুন কবীরের দাবি, সংশ্লিষ্ট জলাশয় ও জমিতে তাঁর বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে। তিনি বলেন, সেখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকার মাছ রয়েছে। পাশাপাশি ৫ লক্ষ টাকার বেশি মূল্যের নৌকা, প্রায় আড়াই লক্ষ টাকার সাবমার্সিবল পাম্প এবং অন্যান্য সামগ্রী মিলিয়ে মোট ৭০ থেকে ৮০ লক্ষ টাকার সম্পত্তি রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, পুলিশের উপস্থিতিতে সেখানে তাঁর সম্পত্তির ক্ষতি করা হয়েছে এবং এখনও ক্ষতি করার চেষ্টা চলছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাঁকে আরও বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলার চেষ্টা হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হবেন বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, লিজ সংক্রান্ত সমস্ত নথি আদালতে পেশ করা হবে এবং কার কাগজ বৈধ, তা আদালতেই নির্ধারিত হবে।
কোম্পানির জমি থেকে মাটি কাটার অভিযোগ
হুমায়ুন কবীর আরও অভিযোগ করেন, ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে রানির বাঁধ এলাকায় খৈতান কোম্পানির জমি থেকে প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা মূল্যের মাটি কাটা হয়েছে। তাঁর দাবি, যাঁরা আগে তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের একাংশের সঙ্গে যোগসাজশে এই মাটি কাটা হয়েছে।
এই ঘটনায় ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতর এবং ব্লক প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। হুমায়ুনের বক্তব্য, মাটি কাটার ক্ষেত্রে সরকারি রয়্যালটি এবং রাজস্ব জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে কি না, তার তদন্ত হওয়া উচিত।
তাঁর আরও অভিযোগ, মাটি কাটার ঘটনায় প্রকৃত তদন্ত না করে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাঁদের স্বল্প সময়ের জন্য জেলে পাঠানো হয়েছে। এরপর সেই পদক্ষেপকেই প্রশাসনিক সাফল্য হিসেবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ বা প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি।
শক্তিপুর থানার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ
এদিন হুমায়ুন কবীরের বক্তব্যের বড় অংশ জুড়ে ছিল শক্তিপুর থানার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ। তাঁর দাবি, তাঁর দলের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কর্মী ও সমর্থকের বাড়িতে পুলিশ যাচ্ছে এবং তাঁদের ভয় দেখানো ও গালিগালাজ করা হচ্ছে।
হুমায়ুন বলেন, কাজীপাড়া, শক্তিপুর-সহ বিভিন্ন এলাকার তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মীদের বাড়িতে গিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাঁর অভিযোগ, পরিচয় জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিক তাঁর সম্পর্কে অশালীন ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করছেন।
এই প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবীর বলেন, তিনি ওই পুলিশ আধিকারিকের সঙ্গে দেখা করবেন, তবে এখনই নয়। জেলা পুলিশ সুপারকে লিখিতভাবে জানিয়ে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে শক্তিপুরে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
“শক্তিপুর থানা ঘেরাও করব”
পুলিশের আচরণের প্রতিবাদে ভবিষ্যতে বড় কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হুমায়ুন কবীর। তিনি বলেন, “গোটা মুর্শিদাবাদ জেলার মানুষকে ডাক দেব। শক্তিপুর থানা ঘেরাও করব। দেখি কে আমাকে আটকায়।”
তবে ঠিক কবে এই কর্মসূচি হবে, তা এখনও ঘোষণা করেননি তিনি। তাঁর বক্তব্য, আগে বর্তমান আইনি ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা দেখা হবে। এরপর শক্তিপুর থানাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী কর্মসূচির দিন ঘোষণা করা হবে।
রেজিনগর ও শক্তিপুর পুলিশের ভূমিকার মধ্যে পার্থক্যের দাবি
হুমায়ুন কবীরের বক্তব্য অনুযায়ী, রেজিনগর থানার পুলিশ তাঁর দলের দুই নেতাকে গ্রেফতার করলেও তাঁদের আচরণ নিয়ে তাঁর কোনও অভিযোগ নেই। তাঁর দাবি, রেজিনগর থানার পুলিশ সরকারি নির্দেশ পালন করেছে, কিন্তু কোনও কর্মীর বাড়িতে গিয়ে গালিগালাজ বা দুর্ব্যবহার করেনি।
অন্যদিকে শক্তিপুর থানার ওসির আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে অভিযোগ তাঁর। তিনি বলেন, কোনও পুলিশ আধিকারিককে রাজনৈতিক কর্মীদের অপমান করার বা তাঁদের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেওয়ার অধিকার দেওয়া যায় না।
খৈতানের জমির লিজ থেকে শুরু করে মাটি কাটার অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা এবং শক্তিপুর থানা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি, হুমায়ুন কবীরের এই বক্তব্য ঘিরে মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন তাঁর অভিযোগের জবাবে পুলিশ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষ থেকে কী প্রতিক্রিয়া আসে, সেদিকেই নজর রয়েছে।
ওসির দুর্নীতির প্রসঙ্গে মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার সচিন মাক্কর জানান, “বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে, তাই আমি এখন এই নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না।” খৈতানের লিজ প্রসঙ্গে জেলা পুলিশ সুপার জানান, “সেটি আপনারা খৈতান কর্তৃপক্ষের কাছে জিজ্ঞাসা করলেই সঠিক তথ্য পেয়ে যাবেন। বাকি বিষয়গুলো আমরা তদন্ত করে দেখছি, তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই বিস্তারিত বলতে পারব।”