রাজ্যে পালাবদলের পর মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের প্রথম সাধারণ সভা, দুর্নীতি নিয়ে তুমুল বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর: রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর প্রথমবার অনুষ্ঠিত হল মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের সাধারণ সভা। শনিবার বহরমপুরে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলার সাংসদ, বিধায়ক, জেলা পরিষদের সদস্য, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং প্রশাসনিক আধিকারিকরা। মূলত ষোড়শ অর্থ কমিশনের আওতায় উন্নয়নমূলক প্রকল্প, আগামী অর্থবর্ষের পরিকল্পনা, জেলা পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সভা শেষে শাসক ও বিরোধী শিবিরের প্রতিনিধিরা পৃথকভাবে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।

জেলা পরিষদের সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানা জানান, সাধারণ সভা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, জেলার দুই সাংসদ, বিভিন্ন বিধায়ক, জেলা পরিষদের সদস্য এবং পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিরা উপস্থিত ছিলেন। সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্ন ও প্রস্তাবের উত্তর দেওয়া হয়েছে এবং জেলা পরিষদের সম্পত্তি, উন্নয়নমূলক প্রকল্প ও বাজেট সংক্রান্ত তথ্য একটি বইয়ের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

তাঁর বক্তব্য, জেলা পরিষদের লক্ষ্য একটাই, জেলার উন্নয়ন। তাই উন্নয়ন সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য সকল জনপ্রতিনিধির জানার অধিকার রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ সমানভাবে বণ্টনের দাবি সদস্যরা তুলেছেন এবং ভবিষ্যতেও সেই নীতি বজায় থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে কী বললেন সভাধিপতি?

গতকালকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জেলা পরিষদে দুর্নীতির অভিযোগ  প্রসঙ্গেও প্রতিক্রিয়া দেন রুবিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, কোন নথি জাল বা বৈধ, তা নির্ধারণের দায়িত্ব প্রশাসনিক আধিকারিকদের। প্রশাসন সেই বিষয়গুলি খতিয়ে দেখছে। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে মানুষের জন্য কাজ করাই ছিল মূল লক্ষ্য এবং ভবিষ্যতেও সেই লক্ষ্যেই কাজ চলবে বলে তিনি দাবি করেন।

এমসিইটি কলেজ নিয়ে বিশেষ বৈঠক, রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে অভিযোগ

জেলা পরিষদের অধীনস্থ এমসিইটি কলেজের আর্থিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা হয়। রুবিয়া সুলতানা জানান, ২ জুলাই কলেজ পরিচালন সমিতির বৈঠক হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, কলেজের রেজিস্ট্রারকে সমস্ত আর্থিক হিসাব ও বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দিতে হবে।

তিনি বলেন, রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ এসেছে। নির্ধারিত সময়ে সন্তোষজনক রিপোর্ট না পেলে তাঁকে অপসারণের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

আরএন টেগর ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ে মামলা, টেন্ডার হবে পরে

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা আরএন টেগর ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সভাধিপতির বক্তব্য, বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন। মামলা নিষ্পত্তি হতে আনুমানিক ছয় থেকে সাত মাস সময় লাগতে পারে। মামলা শেষ হলে নতুন করে টেন্ডার ডেকে কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কংগ্রেস বিধায়ক: গত তিন বছরে সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছে

রানিনগরের কংগ্রেস বিধায়ক জুলফিকার আলি দাবি করেন, গত তিন বছরে জেলা পরিষদে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে কী উঠে আসে এবং ভবিষ্যতে জেলা পরিষদ কীভাবে পরিচালিত হয়। মানুষের স্বার্থেই জেলা পরিষদের স্বচ্ছভাবে চলা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ডোমকলের সিপিআই(এম) বিধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বৈঠকে ষোড়শ অর্থ কমিশনের বিভিন্ন প্রকল্প, উন্নয়নমূলক কাজ এবং জেলা পরিষদের সার্বিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

তিনি জানান, জেলা পরিষদের সদস্য, কর্মাধ্যক্ষ এবং বিধায়কদের মতামত নেওয়া হয়েছে। মুর্শিদাবাদের উন্নয়ন যেন কোনওভাবেই থেমে না থাকে, সে বিষয়েই জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর দুর্নীতি নিয়ে মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অতীতে হওয়া কাজগুলিও পুনরায় যাচাই করা হবে এবং দুর্নীতির ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে।

জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমান জানান, সাধারণ সভায় জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রস্তাব দিয়েছেন। বিশেষ করে রাস্তা, ড্রেন এবং স্থানীয় উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়গুলি তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি বলেন, যেই ঠিকাদারই কাজ করুন না কেন, নির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ হওয়া উচিত। একই সঙ্গে এমসিইটি কলেজ এবং আরএন টেগর ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ে তদন্তের রিপোর্ট ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে পাওয়ার আশাও প্রকাশ করেন তিনি।

মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খান বলেন, যদি দুর্নীতি হয়ে থাকে, তার জন্য একমাত্র জেলা পরিষদের সভাধিপতিকে দায়ী করা যায় না। তাঁর যুক্তি, জেলা পরিষদের এক্সিকিউটিভ অফিসার হলেন জেলা শাসক এবং আর্থিক ক্ষমতাও প্রশাসনের হাতে থাকে।

তিনি বলেন, যদি কোনও আধিকারিক দুর্নীতিতে জড়িত থাকেন, তবে তদন্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বহরমপুরের বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্র বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, এমসিইটি কলেজে বর্তমানে মাত্র ২৮৬ জন ছাত্র পড়াশোনা করছে। অধিকাংশ শিক্ষক নিয়মিত বেতন পান না। কলেজে স্থায়ী অধ্যক্ষ নেই এবং প্রশাসনিক নানা জটিলতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা আরএন টেগর ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জেলা পরিষদের অধীনস্থ মুর্শিদাবাদ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ঐতিহ্যবাহী বিটি মিলের পরিকাঠামোর অবনতির বিষয়ও তুলে ধরেন।

তাঁর অভিযোগ, কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতি আর চলতে পারে না। মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও বিষয়গুলি তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩০ জুলাই অডিট রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন সুব্রত মৈত্র।

একই সঙ্গে তিনি জেলা পরিষদের চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির দাবিও জানান। তাঁর বক্তব্য, পাঁচ-ছয় হাজার টাকায় কর্মচারীদের পক্ষে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন।

জেলা পরিষদের কংগ্রেস সদস্য আব্দুল লাহিল কাফি দাবি করেন, এমসিইটি কলেজ এবং আরএন টেগর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত। পাশাপাশি অতীতের সমস্ত উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

তাঁর অভিযোগ, বিরোধী জনপ্রতিনিধিদের সমানভাবে কাজের সুযোগ দেওয়া হয় না। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে বিরোধীদের বঞ্চিত করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

জেলা পরিষদের কংগ্রেস সদস্য তহিদুর রহমান সুমন বলেন, সাধারণ সভা জেলার উন্নয়নের সর্বোচ্চ আলোচনার মঞ্চ। অথচ দীর্ঘদিন ধরে আরএন টেগর ডায়াগনস্টিক সেন্টার, এমসিইটি কলেজ, ফেরিঘাটের অনিয়ম, রাস্তার বেহাল অবস্থা এবং বর্ষার আগে উন্নয়নমূলক কাজ সম্পূর্ণ না হওয়ার মতো একাধিক সমস্যা রয়ে গেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, জেলা পরিষদে বিরোধী দলের সাংগঠনিক মর্যাদা এখনও দেওয়া হয়নি। পঞ্চায়েত আইনে জেলা কাউন্সিল গঠনের বিধান থাকলেও তা এখনও কার্যকর করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

একই সঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, সরকার পরিবর্তনের পরও জেলার উন্নয়ন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বিরোধী বিধায়কদের না ডাকার কারণ কী? তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক, জেলার উন্নয়নের স্বার্থে সকলকে নিয়ে কাজ করা উচিত।

উন্নয়ন বনাম দুর্নীতি, জেলা পরিষদের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর প্রথম জেলা পরিষদের সাধারণ সভা ঘিরে উন্নয়ন ও দুর্নীতির প্রশ্নই প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। একদিকে শাসকপক্ষ উন্নয়ন, স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে বিরোধীরা অতীতের সমস্ত আর্থিক লেনদেন, উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং অবকাঠামো নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তুলেছে।

এমসিইটি কলেজ, আরএন টেগর ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মুর্শিদাবাদ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বিটি মিল, রাস্তা, ড্রেন, ফেরিঘাট, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বেতন এবং দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত, সব মিলিয়ে আগামী কয়েক মাসে জেলা পরিষদের কার্যকলাপের উপর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নজর আরও বাড়বে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *