নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর: মুর্শিদাবাদ সফরে এসে জেলার উন্নয়ন, গঙ্গা ভাঙন, সামাজিক প্রকল্প, পরিযায়ী শ্রমিক, স্বাস্থ্য পরিষেবা, সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ, মাদক পাচার, নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে বিস্তারিত পর্যালোচনা বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন।
শুভেন্দু অধিকারী জানান, তাঁর মুর্শিদাবাদ সফরে রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি প্রশাসনিক কর্মসূচিও ছিল। প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠকে জেলার বিভিন্ন স্তরের প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। বিডিও, এসডিও, থানার ওসি ও আইসি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, দুই পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার, ডিআইজি এবং জেলা প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের উপস্থিতিতে বৈঠক হয়। জেলা শাসকের নেতৃত্বে জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
গঙ্গা ভাঙন রোধে ৩৬০০ কোটি টাকার প্রস্তাব, মুর্শিদাবাদের জন্য ২৫০০ কোটি
প্রশাসনিক বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় মুর্শিদাবাদের দীর্ঘদিনের গঙ্গা ভাঙন সমস্যা। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার গঙ্গা ভাঙন রোধে মোট ৩৬০০ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্পের প্রস্তাব ভারত সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয়ের ৫০ শতাংশ কেন্দ্রীয় সরকার এবং বাকি ৫০ শতাংশ রাজ্য সরকার বহন করবে।
তিনি দাবি করেন, প্রস্তাবিত ৩৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে মুর্শিদাবাদ জেলার জন্য প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। ফারাক্কা থেকে লালগোলা-ভগবানগোলা পর্যন্ত গঙ্গার ভাঙনপ্রবণ দীর্ঘ অংশে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, প্রকল্পের প্রস্তুতির কাজ চলছে। তাঁর দাবি, ২০২৭ সালে মুর্শিদাবাদের ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ এই প্রকল্পের সুফল পেতে শুরু করবেন। তবে বর্ষা শুরু হয়ে যাওয়ায় চলতি মরসুমে বৃহৎ স্থায়ী কাজ করা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, বর্ষার আগে যে সমস্ত প্রাক-বর্ষা প্রতিরোধমূলক কাজ করা প্রয়োজন ছিল, তার অনেকটাই করা হয়েছে। কোথাও কোনও ঘাটতি থাকলে জেলা শাসক ও সেচ দফতর সমন্বয়ের মাধ্যমে তা পূরণ করবে।
অন্নপূর্ণা যোজনায় ১২ লক্ষ মহিলা উপকৃত হওয়ার দাবি
মুর্শিদাবাদ জেলার সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, জেলায় প্রায় ১৫ লক্ষ মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য আবেদন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১২ লক্ষ মহিলা ১ জুলাই থেকে এই প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন।
একই সঙ্গে পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজ্যে ফিরিয়ে এনে বিভিন্ন কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় আনার জন্য জেলা প্রশাসনকে উদ্যোগী হতে বলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কাজের প্রকল্প, স্বাস্থ্য বিমা, কৃষক সহায়তা, সামাজিক ভাতা, নির্মাণ শ্রমিক ও বিড়ি শ্রমিকদের জন্য থাকা বিভিন্ন সুবিধা একটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতে পারে।
শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা একত্রে পেলে একটি প্রান্তিক পরিবার মাসে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সুবিধা পেতে পারে। এর সঙ্গে বিনামূল্যে রেশন এবং আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সুবিধার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
সামাজিক প্রকল্পে ভুয়ো উপভোক্তার অভিযোগ, দুই মাসের মধ্যে যাচাই শেষ করার নির্দেশ
জেলার বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে ভুয়ো উপভোক্তা থাকার অভিযোগও তোলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের কেওয়াইসি, আধারের সঙ্গে অ্যাকাউন্ট সংযুক্তিকরণ এবং উপভোক্তার পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। এই যাচাই প্রক্রিয়াতেই জেলায় বহু ভুয়ো উপভোক্তার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে বলে তাঁর দাবি।
তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশের কিছু তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ৬০০টি লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অ্যাকাউন্ট এবং প্রায় ৩৫০০টি সংখ্যালঘু স্কলারশিপের অ্যাকাউন্ট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি তাঁর অভিযোগ, তফসিলি জাতি বা উপজাতির অন্তর্ভুক্ত না হয়েও সুবিধা গ্রহণ এবং প্রকৃত প্রতিবন্ধী না হয়েও ভাতা নেওয়ার মতো অনিয়মও তদন্তে উঠে আসছে।
জেলা পরিষদের বিভিন্ন কাজের টেন্ডার ও ওয়ার্ক অর্ডারের ক্ষেত্রেও জমা দেওয়া ক্রেডেনশিয়াল যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, সঠিকভাবে তদন্ত করলে বহু ক্ষেত্রে জাল নথি ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসতে পারে।
শুভেন্দু অধিকারী জেলার মানুষকে আরও দুই মাস সময় দেওয়ার আবেদন জানান। তাঁর বক্তব্য, বিডিওরা জেলার সমস্ত সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের উপভোক্তাদের যাচাইয়ের কাজ সম্পূর্ণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা অসত্য তথ্য দিয়ে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা পরিষেবা বাড়ানোর উদ্যোগ
মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা নিয়েও প্রশাসনিক বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, সাধারণভাবে রোগী রেফারের সংখ্যা কমলেও নিউরোলজি, কার্ডিয়াক এবং নেফ্রোলজির মতো কয়েকটি বিশেষায়িত চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখনও বহু রোগীকে অন্যত্র পাঠাতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির উন্নতির জন্য পাঁচজন সিনিয়র চিকিৎসক দেওয়ার কথা জানান তিনি। অধ্যাপক ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর স্তরের চিকিৎসকদের মাধ্যমে বিশেষায়িত পরিষেবা শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা বলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগে ২০টি করে শয্যা, ক্যাথল্যাব পরিষেবা এবং ডায়ালিসিসের আরও দুটি ইউনিট বাড়ানোর কথাও জানান তিনি।
তাঁর আশা, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে মুর্শিদাবাদ জেলার উন্নয়নের কাজে নতুন গতি আসবে। জেলা শাসক ও তাঁর প্রশাসনিক দলের প্রশংসা করে তিনি বলেন, আধিকারিকদের চাপমুক্ত হয়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধে বিএসএফের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে মুর্শিদাবাদের সীমান্ত নিরাপত্তা প্রশাসনিক বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী জানান, অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য, সীমান্ত এলাকায় পুলিশকে বিএসএফের সঙ্গে আরও বেশি সমন্বয় রেখে কাজ করতে হবে। অনুপ্রবেশের পাশাপাশি মাদক পাচার, অবৈধ মদের কারবার এবং সীমান্তপথে নারকোটিক্সের যাতায়াতের বিরুদ্ধেও কঠোর ও ধারাবাহিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের পিছনে মাদক ও অবৈধ নেশার কারবারকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি পুলিশকে নিয়মিত অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
বিএসএফের জন্য জমি হস্তান্তরের অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ
সীমান্ত নিরাপত্তা পরিকাঠামোর জন্য বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। জেলা প্রশাসন এবং ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের কাজের প্রশংসা করেন শুভেন্দু অধিকারী।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিএসএফের জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে দ্রুত জমি হস্তান্তরের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
ধুলিয়ান, শামসেরগঞ্জ, বেলডাঙা, রেজিনগর ও শক্তিপুরের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কড়া নির্দেশ
জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ প্রশাসনকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান শুভেন্দু অধিকারী। ধুলিয়ান, শামসেরগঞ্জ, বেলডাঙা, রেজিনগর ও শক্তিপুরের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে পুলিশকে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশকে রাজনৈতিক নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং পুলিশের প্রশিক্ষণ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রেললাইন ভাঙচুর, ট্রেনে বা রেল সম্পত্তিতে আগুন, বাস পোড়ানো, থানা ও সরকারি অফিসে হামলা এবং পুলিশকর্মীদের আক্রমণের মতো ঘটনা আর বরদাস্ত করা হবে না বলেও কঠোর বার্তা দেন তিনি।
নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং নারী পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা
নারী ও শিশু সুরক্ষার বিষয়টিও প্রশাসনিক বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় নারী পাচার প্রতিরোধে পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারী জানান, নারী নির্যাতন ও পাচার সংক্রান্ত যে সমস্ত মামলায় নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর উচ্চ আদালতে মামলা আটকে রয়েছে, সেগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রশাসনিক স্তরে আইনি সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
জেলা শাসককে স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটরদের সঙ্গে কথা বলতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কলকাতায় রাজ্যের আইনজীবীদের সঙ্গে সমন্বয় করে মামলাগুলি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যোগী হতে বলা হয়েছে।
ধর্মীয় উৎসবে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতার প্রশংসা
জেলার সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, মুর্শিদাবাদে সম্প্রতি বকরি ঈদ ও মহরমের মতো বড় ধর্মীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সামনে রথযাত্রা এবং শ্রাবণ মাসের জলযাত্রার মতো কর্মসূচিও রয়েছে।
সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসন এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের সহযোগিতায় সাম্প্রতিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, সকলকে আইন মেনে চলতে হবে। সংবিধান, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, হাই কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের রায়, ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের গাইডলাইন এবং সরকারি নির্দেশ কার্যকর করার দায়িত্ব জেলা শাসক ও পুলিশ সুপারের। তাঁর বক্তব্য, প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই কাজ করছে এবং এখনও পর্যন্ত সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে।
উস্কানিমূলক বক্তব্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান
শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, গত দুই মাসে জেলায় বড় ধরনের কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে কিছু উস্কানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।
তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের উদ্দেশে উত্তেজনামূলক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। থানার সামনে দাঁড়িয়ে জনসমাবেশ, জেল ভরানোর হুমকি বা কোনও সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে উত্তেজনামূলক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার কথাও বলেন তিনি।
প্রশাসন বা পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সরাসরি জানানোর বার্তা
জেলার পুলিশ বা সিভিল প্রশাসনের বিরুদ্ধে কারও নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা তাঁর কাছে পাঠানোর আহ্বান জানান শুভেন্দু অধিকারী। অভিযোগ পেলে যথাযথভাবে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের সম্মান করার জন্য প্রশাসনিক আধিকারিকদের বার্তা দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বিধায়ক ও সাংসদদের ন্যায্য কাজ দ্রুত করা উচিত এবং প্রশাসনিক কাজে রাজনৈতিক বৈষম্য করা উচিত নয়।
ইউসিসি কমিটি কাজ শুরু করেছে, বিধানসভায় বিল আনার আশা
ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি প্রসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী জানান, ইতিমধ্যেই কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা দেশাইয়ের নেতৃত্বে কমিশন কাজ শুরু করেছে। তাঁর আশা, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত ইউনিফর্ম সিভিল কোড বিধানসভায় আনা সম্ভব হবে।
পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত একটি বিল রাজ্যপালের অনুমোদন পেয়েছে এবং তা কার্যকর করার প্রক্রিয়ার কথাও জানান তিনি।
জন্ম সনদ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে ৩৪টি তদন্ত, সিআইডিও তদন্তে
জন্ম সনদ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ নিয়েও বক্তব্য রাখেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, এই বিষয়ে ৩৪টি তদন্ত চলছে এবং সিআইডিও তদন্ত করছে।
তাঁর বক্তব্য, তদন্তে কোনও আধিকারিক বা কর্মীর প্রত্যক্ষ যোগসাজশ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চাকরি যেতে পারে এবং আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। তিনি বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
কিরীটেশ্বরী মন্দিরকে ঘিরে তীর্থ সার্কিট পরিকল্পনা
মুর্শিদাবাদের পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী জানান, কিরীটেশ্বরী মন্দিরকে নতুন তীর্থ সার্কিটের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ধর্মীয় পর্যটনকে কেন্দ্র করে জেলার পরিকাঠামো ও পর্যটন সম্ভাবনার উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
জেলায় মন্ত্রীদের মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব
জেলার উন্নয়ন প্রকল্পগুলির অগ্রগতি এবং বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর জন্য বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষকে বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে সমন্বয় এবং রাজ্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক সভায় বিরোধী বিধায়কদের না ডাকা নিয়ে যা বললেন
প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধী দলের বিধায়কদের আমন্ত্রণ না জানানো নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, এদিনের বৈঠকের প্রকৃতি আলাদা ছিল এবং নির্দিষ্ট কয়েকজন মন্ত্রীকে ডাকা হয়েছিল। ভবিষ্যতে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক হলে জেলার সমস্ত বিধায়ক ও সাংসদকে ডাকা হবে বলে তিনি জানান।
মুর্শিদাবাদ জেলা ভাগের প্রক্রিয়া শুরু, সময় লাগতে পারে ছয় থেকে আট মাস
মুর্শিদাবাদ জেলা ভাগের প্রসঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তবে জেলা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একাধিক প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
তাঁর বক্তব্য, হাই কোর্ট, ভারত সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। তাই তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। গোটা প্রক্রিয়া শেষ করতে ন্যূনতম ছয় থেকে আট মাস সময় লাগতে পারে বলে তিনি জানান। আইন মেনেই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া করা হবে বলে স্পষ্ট করেন তিনি।
“দুই-তিন মাসে উন্নয়নে নতুন শক্তি পাবে মুর্শিদাবাদ”
সাংবাদিক বৈঠকের শেষে শুভেন্দু অধিকারী আশাপ্রকাশ করেন, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে মুর্শিদাবাদ জেলার উন্নয়নমূলক কাজে দৃশ্যমান গতি আসবে। গঙ্গা ভাঙন প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য পরিষেবার সম্প্রসারণ, সামাজিক প্রকল্পে প্রকৃত উপভোক্তা চিহ্নিতকরণ, সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক ও নারী পাচার রোধ, পর্যটনের উন্নয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকে প্রশাসনের অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসন এবং পুলিশকে চাপমুক্তভাবে আইন অনুযায়ী কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বার্তা, উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা, দুই ক্ষেত্রেই মুর্শিদাবাদকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে সরকার।