মুর্শিদাবাদ: ‘স্যাঁটা ভাঙ্গা’ মন্তব্য ঘিরে দায়ের হওয়া মামলায় অবশেষে আজকে রেজিনগর থানায় হাজিরা দিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবির। রেজিনগর থানায় দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার পর বাইরে বেরিয়ে পুলিশের প্রশ্নমালা, নিজের জবাব এবং পরবর্তী হাজিরার বিষয়ে বিস্তারিত জানালেন বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। তাঁর দাবি, গত ২৬ জুন কাশীপুরে দেওয়া একটি বক্তব্যের জেরে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সেই মামলার তদন্তের অংশ হিসেবেই তাঁকে রেজিনগর থানায় ডেকে দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
থানা থেকে বেরিয়ে হুমায়ুন কবীর জানান, তিনি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা থানায় ছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রেজিনগর থানার মামলা নম্বর ২১৯/২০২৬, তারিখ ২৭ জুন ২০২৬। মামলার তদন্তকারী অফিসার এসআই বিজন রায় এবং অন্যান্য পুলিশ আধিকারিকরা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
হুমায়ুন কবীরের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ প্রায় ১০ থেকে ১৪ পাতার একটি প্রশ্নমালা তৈরি করেছিল। সেই প্রশ্নমালার বিভিন্ন বিষয় ধরে তাঁকে প্রশ্ন করা হয় এবং তিনি নিজের সাধ্যমতো প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেন, একাধিক পুলিশ আধিকারিক পর্যায়ক্রমে তাঁকে প্রশ্ন করেছেন। একটি পর্যায়ে অফিসার পরিবর্তন করেও তাঁকে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পুরো জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়ার ভিডিও রেকর্ডিং করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিনের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলেও তদন্তের স্বার্থে তাঁকে আবার থানায় হাজির হতে হবে। হুমায়ুন কবীর জানান, আগামী ১৪ জুলাই বেলা ১১টার সময় তাঁকে পুনরায় রেজিনগর থানায় হাজির হতে বলা হয়েছে। সেই সংক্রান্ত একটি নোটিসও তিনি গ্রহণ করেছেন। পুলিশের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হুমায়ুন কবীর জানান, পুলিশ আধিকারিকরা তাঁদের দায়িত্ব এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করেছেন। তিনি বলেন, পুলিশ যা যা প্রশ্ন করেছে, তিনি তার যথাযথ উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
এদিকে, হুমায়ুন কবীর থানায় থাকাকালীন তাঁর বাড়ির সামনে বিজেপির কিছু কর্মী-সমর্থকের দলীয় পতাকা লাগানোর অভিযোগ নিয়েও তাঁকে প্রশ্ন করা হয়। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিজেপি দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং তারা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারে। তিনি কখনও বলেননি যে বিজেপিকে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না।
তবে বিজেপির একাংশের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণের অভিযোগ করেন হুমায়ুন কবীর। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকতেই পারে, কিন্তু কেউ সরকারে ক্ষমতায় এসেছে বলে আইনের ঊর্ধ্বে চলে যায় না। তিনি নিজেও আইনের ঊর্ধ্বে নন এবং একই নিয়ম সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
হুমায়ুন কবীর আরও বলেন, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের আচরণ সংযত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মানুষের সমস্যা এবং এলাকার উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিজের বক্তব্যে মুর্শিদাবাদ জেলার একাধিক অসম্পূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রসঙ্গও তোলেন হুমায়ুন কবীর। রেজিনগর শিল্পতালুক, রামনগরের সুগার মিল, বহরমপুর থেকে রামনগর ঘাট পর্যন্ত রাস্তা এবং নওদা এলাকার একাধিক রাস্তার দুরবস্থার কথা উল্লেখ করেন তিনি। ত্রিমোহিনী থেকে দুধসর পর্যন্ত রাস্তার অবস্থাও মানুষের চলাচলের উপযুক্ত নয় বলে অভিযোগ করেন।
হুমায়ুন কবীরের দাবি, এসব উন্নয়নমূলক সমস্যার বিষয়ে তিনি লিখিতভাবে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। মালদার প্রশাসনিক বৈঠকেও তিনি বিষয়গুলি তুলে ধরেছিলেন বলে জানান।
রাজনৈতিক সংঘাতের প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবীর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তাঁর উপর ব্যক্তিগত আক্রমণ বা তাঁর রাজনৈতিক দলের উপর আক্রমণ হলে তিনি চুপ করে থাকবেন না। তাঁর বক্তব্য, আইন সকলের জন্য সমানভাবে কার্যকর হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে নিজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন হুমায়ুন কবীর। তাঁর অভিযোগ, ইমেল, হোয়াটসঅ্যাপ এবং সরাসরি ফোনের মাধ্যমে তাঁকে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
তিনি জানান, এই হুমকির বিষয়ে বহরমপুর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। পাশাপাশি রেজিনগর থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং রাজ্য পুলিশের ডিজিপির কাছেও ইমেল মারফত অভিযোগ পাঠিয়েছেন বলে দাবি করেন।
হুমায়ুন কবীরের অভিযোগ, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পুলিশ দ্রুত সক্রিয় হয়, কিন্তু তিনি নিজে হুমকির অভিযোগ জানালে একই ধরনের তৎপরতা দেখা যায় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই ধরনের দ্বৈত আচরণ গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন হুমায়ুন কবীর। তাঁর বক্তব্য, প্রশাসন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করলে তিনিও তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। আপাতত ১৪ জুলাইয়ের পরবর্তী হাজিরাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলের নজর রয়েছে রেজিনগরের দিকে।