নিউজ ফ্রন্ট: ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীদের প্রায় ৪০ শতাংশই নিজেদের কেন্দ্রে মোট প্রদত্ত ভোটের ৫০ শতাংশের কম ভোট পেয়েও জয়ী হয়েছেন। এমনই তথ্য উঠে এসেছে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (ADR) এবং West Bengal Election Watch-এর যৌথ রিপোর্টে।
রিপোর্টে ২৯৪টির মধ্যে ২৯৩টি বিধানসভা কেন্দ্রের ফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলতা কেন্দ্রের তথ্য এই বিশ্লেষণের বাইরে রাখা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল ৯৩.৭ শতাংশ, যা ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ৮২.৩ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ADR-এর তথ্য বলছে, জয়ী প্রার্থীরা গড়ে মোট প্রদত্ত ভোটের ৫০.৪৩ শতাংশ পেয়েছেন। ২০২১ সালে এই গড় ছিল ৫০.১৬ শতাংশ। বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ১৭৫ জন জয়ী প্রার্থী অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ প্রার্থী নিজেদের কেন্দ্রে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে, ১১৮ জন জয়ী প্রার্থী ৫০ শতাংশের কম ভোট পেয়েও নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।
রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জয়ী প্রার্থীরা গড়ে মোট নথিভুক্ত ভোটারের ৪৭.২০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে এই হার ছিল ৪১.২৯ শতাংশ। অর্থাৎ, এবারের নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ যেমন বেড়েছে, তেমনই জয়ী প্রার্থীদের প্রতিনিধিত্বের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রার্থীদের অপরাধমূলক পটভূমি এবং আর্থিক অবস্থার সঙ্গে নির্বাচনী ফলাফলের সম্পর্কও বিশ্লেষণ করেছে ADR। রিপোর্ট অনুযায়ী, ঘোষিত ফৌজদারি মামলাযুক্ত ১৯১ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ১২১ জন অর্থাৎ প্রায় ৬৩ শতাংশ প্রার্থী ৫০ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। এদের মধ্যে ১০৭ জন এমন প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধমূলক মামলা ছিল না।
অন্যদিকে, পরিষ্কার ভাবমূর্তির ১০২ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৫১ জন এমন প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্পত্তির নিরিখেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে ADR-এর রিপোর্টে। ১৭৯ জন কোটিপতি জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৬২ জন অ-কোটিপতি প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে জয়ী হয়েছেন। অর্থাৎ আর্থিকভাবে সচ্ছল প্রার্থীদের প্রভাব নির্বাচনী ফলাফলে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের।
এবারের নির্বাচনে একাধিক কেন্দ্রে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইও দেখা গিয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, মাত্র ১,০০০ ভোটের কম ব্যবধানে জয় পেয়েছেন ৫ জন প্রার্থী। অন্যদিকে, ৪০ শতাংশের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন মাত্র ৩ জন প্রার্থী। ফলে বেশ কিছু কেন্দ্রে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছবি স্পষ্ট হয়েছে।
মহিলা প্রার্থীদের ফলাফলও আলাদা করে বিশ্লেষণ করেছে ADR। রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্লেষিত ২৯৩ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩৭ জন ছিলেন মহিলা। প্রত্যেক মহিলা জয়ী প্রার্থীই ৩৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। মহিলা প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন বিজেপির শিখা চট্টোপাধ্যায়। ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি কেন্দ্র থেকে তিনি ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন এবং তাঁর জয়ের ব্যবধান ছিল ৩৯ শতাংশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ADR-এর এই রিপোর্ট পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা তুলে ধরেছে। উচ্চ ভোটদান, কম ব্যবধানে জয়, অপরাধমূলক পটভূমিযুক্ত প্রার্থীদের সাফল্য এবং কোটিপতি প্রার্থীদের প্রভাব আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।