‘সিংঘম-পুষ্পা’ দ্বৈরথের পর অবশেষে এসটিএফের খাঁচায় ডন
নিউজ ফ্রন্ট, ৮ জুন, ২০২৬: পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)-এর জালে অবশেষে ধরা পড়লেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতার অত্যন্ত প্রভাবশালী তৃণমূল কংগ্রেস নেতা তথা প্রাক্তন বিধায়ক জাহাঙ্গীর খান। সোমবার ভোরে নেপাল সীমান্ত থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, আইনি জট কাটতেই গা ঢাকা দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে নেপালে পালিয়ে যাওয়ার ছক কষছিলেন এই বাহুবলী নেতা। রাজ্য পুলিশের এই পদক্ষেপকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি মস্ত বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাহাঙ্গীর খানের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, খুনের চেষ্টা, ভোট-পরবর্তী হিংসা ছড়ানোর পাশাপাশি বেআইনি অস্ত্র রাখার মতো একাধিক গুরুতর ফৌজদারি মামলা রুজু রয়েছে। রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর ফলতার বহু সাধারণ গ্রামবাসী তাঁর বিরুদ্ধে জমি দখল ও জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগ এনে সরব হয়েছিলেন।গত সপ্তাহের শুরুতেই তাঁর গ্রেপ্তারের পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। গত ২৬ মে কলকাতা হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চের বিচারপতি পার্থ সারথি চট্টোপাধ্যায় ৫টি এফআইআর-এর ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীর খানের অন্তর্বর্তীকালীন আইনি সুরক্ষার মেয়াদ বাড়াতে অস্বীকার করেন এবং বিষয়টি নিয়মিত বেঞ্চে স্থানান্তরিত করেন। এর আগে, গত ২১ মে ফলতায় পুনর্নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে ২৬ মে পর্যন্ত তাঁর সুরক্ষার মেয়াদ বাড়িয়েছিলেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। আদালতের সেই আইনি রক্ষাকবচ উঠতেই কোমর বেঁধে মাঠে নামে এসটিএফ।ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল হয়েছিল। এর আগে ইভিএম ভাঙচুর ও কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন কমিশন ফলতার ভোট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। এরপর গত ২১ মে সেখানে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।কিন্তু ভোটের ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে এক নাটকীয় মোড় এনে সাংবাদিক বৈঠক করেন জাহাঙ্গীর খান। তিনি আচমকাই লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করে জানান— “মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষিত বিশেষ অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন প্যাকেজকে সমর্থন জানিয়ে আমি ফলতার স্বার্থে এই নির্বাচন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছি।”যদিও ততক্ষণে ব্যালট পেপারে তৃণমূলের প্রতীকের পাশে তাঁর নাম নথিভুক্ত হয়ে গিয়েছিল। প্রত্যাহারের পর ভোটে লড়ে তিনি চতুর্থ স্থান লাভ করেন এবং বিজেপি প্রার্থী এই আসনে জয়ী হন। এই পরাজয়ের পর থেকেই নিজের এলাকা ও দলীয় কার্যালয় থেকে সম্পূর্ণ বেপাত্তা হয়ে যান জাহাঙ্গীর।
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে জাহাঙ্গীর খানকে দলের হেভিওয়েট নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বলে মনে করা হতো। ফলতা এলাকায় তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা রাজনৈতিক মহলে সর্বজনবিদিত।নির্বাচনের সময় যখন কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তরফে কড়া আইপিএস অফিসার অজয়পাল শর্মাকে বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল, তখন জাহাঙ্গীরের একটি ডায়লগ রাজ্য রাজনীতিতে মারাত্মক শোরগোল ফেলেছিল। অজয়পাল শর্মার কড়া নজরদারির জবাবে জাহাঙ্গীর সংবাদমাধ্যমের সামনে হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন:“অজয়পাল শর্মা যদি নিজেকে সিংহাম ভাবেন, তবে মনে রাখবেন—আমিও পুষ্পা (ঝুঁকেগা নেহি)।”তবে সেই ‘পুষ্পা’র দৌড় যে শেষ পর্যন্ত নেপাল সীমান্তেই থমকে যাবে, তা হয়তো খোদ জাহাঙ্গীরও কল্পনা করতে পারেননি। ধৃত নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইতিমধ্যেই কলকাতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এসটিএফ আধিকারিকদের অনুমান, জাহাঙ্গীরকে জেরা করে ফলতা অঞ্চলের বহু বেআইনি অস্ত্র সিন্ডিকেট এবং আর্থিক দুর্নীতির হদিশ মিলতে পারে।