গঙ্গা-পদ্মা নেভিগেশনাল ক্যানেলের দাবি মহম্মদ সেলিমের
মুর্শিদাবাদ: বেআইনি উচ্ছেদ, হকারদের জীবিকার সংকট, বেকারত্ব এবং গঙ্গা ভাঙন নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিজেপি সরকারকে তীব্র আক্রমণ করলেন মহম্মদ সেলিম। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক জানান, আগামী ৪ জুলাই কলকাতায় বেআইনি উচ্ছেদ এবং ‘বুলডোজার রাজনীতি’র বিরুদ্ধে বড় আন্দোলন কর্মসূচি পালন করা হবে। একই সঙ্গে গঙ্গা ভাঙন রোধ এবং নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য গঙ্গা ও পদ্মার মধ্যে একটি নেভিগেশনাল ক্যানেল তৈরির দাবিও তুলেছেন তিনি।
মহম্মদ সেলিম জানান, বিধানসভা নির্বাচনের পর দ্বিতীয় পর্যায়ে দলের জেলা কমিটির বৈঠক চলছে। বিভিন্ন এরিয়া কমিটি এবং শাখা স্তরে যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক আলোচনা হয়েছে, তার নির্যাস জেলা কমিটির বৈঠকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আগামীকাল শিলিগুড়িতে জেলা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলেও তিনি জানান।
৪ জুলাই কলকাতায় দুই দিক থেকে মিছিল
মহম্মদ সেলিম বলেন, দোকান, বস্তি, হকার, রেল এলাকা, পৌর এলাকা এবং গ্রামাঞ্চলে যেভাবে উচ্ছেদ অভিযান চলছে, তার বিরুদ্ধে আগামী ৪ জুলাই কলকাতায় বড় কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বুলডোজার এখন একটি নতুন ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আক্রমণের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষ সরকার নির্বাচন করে গড়ার জন্য, কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভাঙার কাজ শুরু করেছে। এই নীতির বিরুদ্ধে হাওড়া ও শিয়ালদা দিক থেকে দুটি মিছিল কলকাতার ফেয়ারলি প্লেসে পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজারের দফতরের সামনে পৌঁছবে। কর্মসূচিতে উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, হকার, দোকানদার এবং সাধারণ গরিব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
কর্মসংস্থান দেওয়ার বদলে মানুষকে বেকার করা হচ্ছে, অভিযোগ সেলিমের
বিজেপি সরকারকে নিশানা করে মহম্মদ সেলিম অভিযোগ করেন, যারা বেকার যুবক-যুবতীদের চাকরি ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারাই এখন স্বনির্ভর মানুষের জীবিকা কেড়ে নিয়ে নতুন করে বেকারত্ব তৈরি করছে। তাঁর বক্তব্য, হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ শুধুমাত্র শহরের সমস্যা নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রামীণ অর্থনীতির উপরও। গ্রামের কৃষক, পশুপালক, তাঁতশিল্পী এবং ক্ষুদ্র উৎপাদকদের পণ্য শহর ও শহরতলির ছোট বাজার, দোকান এবং হকারদের মাধ্যমে বিক্রি হয়। এই বিক্রয়ব্যবস্থা ধ্বংস হলে গ্রামের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেলিমের অভিযোগ, বড় বড় মাল্টিব্র্যান্ড মল এবং বহুজাতিক ও বৃহৎ দেশীয় সংস্থার জন্য বাজারের পরিসর তৈরি করা হচ্ছে। অনলাইন ও অফলাইন ব্যবস্থায় বড় কোম্পানির পণ্য বিক্রির সুযোগ বাড়ানো হলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, যে যুবক নিজে ব্যবসা করে একজন ছোট উদ্যোক্তা হিসেবে জীবনধারণ করছিলেন, তাঁকে ব্যবসা থেকে সরিয়ে কোনও বড় সংস্থার ‘ডেলিভারি বয়’ বানানো কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়।
রেল হকারদের জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ
শিয়ালদা রেলপথ এবং অন্যান্য রেল এলাকায় হকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক। তাঁর বক্তব্য, উদ্বাস্তু সমস্যার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে শিয়ালদা শাখায় বিপুল সংখ্যক মানুষ ছোট ব্যবসা ও হকারির উপর নির্ভরশীল। এখন তাঁদের কাজ করতে না দেওয়া এবং জরিমানা করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নদিয়ায় এক ঝালমুড়ি বিক্রেতার আত্মহত্যার ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে সেলিম বলেন, হতাশা থেকে আত্মহনন কোনও পথ নয়। বামপন্থীরা মানুষের আত্মপ্রতিষ্ঠা এবং জীবিকার অধিকার রক্ষার জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা বলে।
“প্রতিবাদের রং লাল”
রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মহম্মদ সেলিম বলেন, ২০১১ সালের পরিবর্তনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অন্যায়, অত্যাচার, লুট এবং গুন্ডামির অভিযোগ তুলে যখন বামেরা আন্দোলন করত, তখন অনেকেই দলীয় পতাকা ছাড়া প্রতিবাদের কথা বলতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে এবং মানুষ লাল পতাকা নিয়েই প্রতিবাদের কথা বলছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর কথায়, “প্রতিবাদের রং হচ্ছে লাল।”
সেলিম বলেন, গাজায় শিশুদের মৃত্যু এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যেমন বিশ্বজুড়ে বামপন্থীরা আন্দোলন করছেন, তেমনই দেশের বড় কর্পোরেট সংস্থার বিপুল পরিমাণ ঋণ মকুব এবং সাধারণ মানুষের উপর আর্থিক চাপ বৃদ্ধির বিরুদ্ধেও বামপন্থীরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
শিক্ষা ও নিয়োগ দুর্নীতি নিয়েও সরব
শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ নিয়েও সরব হন মহম্মদ সেলিম। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে চাকরির পরীক্ষায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেমন আন্দোলন হয়েছে, তেমনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরীক্ষা ও নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। তিনি দাবি করেন, যারা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নে প্রতিবাদ করছেন, তাঁদের বিভিন্নভাবে দাগিয়ে দেওয়া এবং আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা হচ্ছে। এই সমস্ত আন্দোলনের প্রতি বামেদের সংহতি থাকবে বলে জানান তিনি।
ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্যের ডাক
মহম্মদ সেলিম অভিযোগ করেন, মানুষের জীবিকা, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক প্রশ্ন থেকে নজর ঘোরাতে ধর্ম, জাতি, ভাষা এবং জনগোষ্ঠীর ভিত্তিতে বিভাজনের রাজনীতি করা হচ্ছে। তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং ভাষা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জীবিকার অধিকার রক্ষার আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর দাবি, বিভাজনের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত শাসক দলের রাজনৈতিক স্বার্থকেই সাহায্য করে।
“এটা আর ডেপুটেশনের পর্যায়ে নেই”
উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে সেলিম বলেন, বিষয়টি এখন আর শুধু স্মারকলিপি বা ডেপুটেশন দেওয়ার পর্যায়ে নেই। তাঁর অভিযোগ, আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসার পরেও অনেক ক্ষেত্রে সেই নথি দেখতে চাওয়া হচ্ছে না এবং ‘দিল্লির নির্দেশ’-এর কথা বলা হচ্ছে। সেলিমের কটাক্ষ, আগে রাজ্য প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ‘কালীঘাটের নির্দেশ’-এর অভিযোগ উঠত, এখন ‘নাগপুর বা দিল্লির নির্দেশ’-এর কথা বলা হচ্ছে।
গঙ্গা ভাঙন নিয়ে ডাবল ইঞ্জিন সরকারকে নিশানা
মুর্শিদাবাদ-সহ গঙ্গা তীরবর্তী অঞ্চলের ভাঙন পরিস্থিতি নিয়েও কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করেন মহম্মদ সেলিম। তাঁর বক্তব্য, আগে কেন্দ্র রাজ্যকে দোষ দিত এবং রাজ্য কেন্দ্রকে দোষ দিত। এখন একই রাজনৈতিক দলের সরকার কেন্দ্র ও রাজ্যে থাকায় দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, “এখন ডাবল ইঞ্জিন সরকার। তারা গঙ্গা ভাঙন রোধ করে দেখাক। মানুষের ঘরবাড়ি না ভেঙে, নদীতে যে ঘরবাড়ি, মাঠ, মন্দির, মসজিদ, হাট, বাজার এবং খেলার মাঠ ভেঙে চলে যাচ্ছে, সেই ভাঙন আটকানোর ব্যবস্থা করুক।”
সেলিমের দাবি, গঙ্গায় পলি জমার কারণে নদীর জল বহন ক্ষমতা কমছে। তাই নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত ড্রেজিংয়ের জন্য পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। নৌ পরিবহন বৃদ্ধি করা গেলে জ্বালানি খরচও কমানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভারতমালা ও কোস্টাল শিপিং প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন
কেন্দ্রের বিভিন্ন পরিকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সেলিম। ভারতমালা প্রকল্প এবং কোস্টাল শিপিংয়ের প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানতে চান, এই সমস্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি কোথায়।
তাঁর বক্তব্য, সড়ক পরিবহনের পাশাপাশি নদীপথে পণ্য পরিবহন বাড়ানো গেলে পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানির ব্যবহার কমানো সম্ভব। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গঙ্গা-পদ্মা নেভিগেশনাল ক্যানেলের দাবি
গঙ্গা ভাঙন রোধ এবং নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য গঙ্গা ও পদ্মার মধ্যে একটি নেভিগেশনাল ক্যানেল তৈরির দাবি তোলেন মহম্মদ সেলিম। তাঁর বক্তব্য, এই প্রস্তাব নতুন নয়, দীর্ঘদিন ধরেই এমন একটি পরিকল্পনার কথা রয়েছে। কিন্তু জনপ্রতিনিধি বা সরকার কোনও পক্ষই বিষয়টি নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। সেলিমের দাবি, গঙ্গা ও পদ্মার মধ্যে সরাসরি নৌপথ তৈরি হলে উত্তর ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গের এই অংশের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতে পণ্য পরিবহনের পথও সংক্ষিপ্ত হতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে জলপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অনেকটা ঘুরপথ ব্যবহার করতে হয়। গঙ্গা-পদ্মা সংযোগকারী নেভিগেশনাল ক্যানেল তৈরি হলে সরাসরি এবং তুলনামূলক কম দূরত্বে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে। সেলিমের মতে, পরিকল্পিতভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়তে পারে, অবৈধ পাচারের প্রবণতা কমতে পারে, সরকারের শুল্ক আদায় বৃদ্ধি পেতে পারে এবং মুর্শিদাবাদ-সহ সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।