নিউজ ফ্রন্ট, বহরমপুর: মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-র সাংবাদিক বৈঠকে প্রকাশ্যে আসা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দুর্নীতি’ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। মহিলাদের জন্য চালু হওয়া জনপ্রিয় প্রকল্পে এক পুরুষের নামেই দীর্ঘদিন ধরে টাকা ঢোকার অভিযোগ সামনে আসতেই প্রশাসনিক মহলে শুরু হয়েছে তোলপাড়। সেই অভিযুক্ত ব্যক্তি মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের বাসিন্দা রাকিবুল শেখ। বুধবার রাতে তাঁকে আটক করেছে বহরমপুর থানার পুলিশ।
অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম প্রকাশ উপলক্ষে নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই তিনি দাবি করেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে এবং প্রায় ৩০ লক্ষ ‘ভুয়ো’ নাম প্রকল্পের তালিকায় ঢুকে রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন বহরমপুরের রাকিবুল শেখের নাম। তিনি বলেন, “২ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষ বর্তমানে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা পান। কিন্তু যাচাই করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে বহু ভুয়ো নাম ঢুকে রয়েছে। বহরমপুরের রাকিবুল শেখ নামে এক পুরুষ দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পের টাকা পাচ্ছেন।”
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়ায়। এরপরই বহরমপুরের রাধারঘাট এলাকার বাসিন্দা রাকিবুল শেখকে খুঁজতে শুরু করে পুলিশ। শেষ পর্যন্ত বুধবার রাতে তাঁকে আটক করে বহরমপুর থানার পুলিশ। বর্তমানে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গোটা ঘটনার উৎস ও প্রশাসনিক গাফিলতির দিকগুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রাকিবুল শেখ পেশায় হোটেল ব্যবসায়ী। বহরমপুরে রাস্তার ধারে তাঁর একটি ছোট খাবারের দোকান রয়েছে, যেখানে বিরিয়ানি ও চাউমিন বিক্রি করা হয়। অভিযোগ, প্রায় তিন বছর আগে স্ত্রীর সঙ্গে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। এরপর থেকেই প্রতি মাসে তাঁর অ্যাকাউন্টে দেড় হাজার টাকা করে ঢুকতে শুরু করে।
তবে রাকিবুলের দাবি, তিনি নিজে কখনও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জন্য আবেদন করেননি। তাঁর কথায়, “আমি প্রথমে বুঝতেই পারিনি কীভাবে টাকা ঢুকছে। ব্যালেন্স চেক করতে গিয়ে দেখি টাকা এসেছে। পরে বিডিও অফিসেও গিয়েছিলাম। বলেছিলাম আমার নাম বাদ দিন। কিন্তু কেউ কোনও গুরুত্ব দেয়নি।”
তিনি আরও দাবি করেন, পরে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করলে তাঁরা তাঁকে টাকা ফেরত না দিতে পরামর্শ দেন। রাকিবুলের বক্তব্য, “বন্ধুরা বলেছিল যখন টাকা ঢুকছে তখন নিতে সমস্যা কোথায়? আমি একা দুর্নীতি করিনি। ওই সময় সব জায়গাতেই দুর্নীতি চলছিল।”
রাকিবুলের স্ত্রীও একই প্রকল্পের সুবিধাভোগী বলে জানা গিয়েছে। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, দু’জনের নামই বর্তমানে এসআইআরের বিচারাধীন তালিকায় রয়েছে। ফলে তাঁরা এবারের নির্বাচনে ভোটও দিতে পারেননি বলে স্থানীয় সূত্রে খবর।
ঘটনার পর রাজনৈতিক চাপানউতোরও তীব্র হয়েছে। বিরোধীরা দাবি করছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক যাচাই ছাড়াই প্রকল্প চালানোর ফলেই এমন অনিয়ম সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে শাসক শিবিরের একাংশের বক্তব্য, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে তালিকা পুনরায় যাচাই শুরু করাতেই এই ধরনের অনিয়ম সামনে আসছে।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন স্পষ্ট জানিয়েছেন, অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম প্রত্যেককে নতুন করে পূরণ করতে হবে এবং সমস্ত তথ্য পুনরায় যাচাই করা হবে। তাঁর কথায়, “যেখানে মহিলাদের জন্য প্রকল্প, সেখানে পুরুষের নাম ঢুকে যাচ্ছে। এর মানে ভেরিফিকেশনে বড় গাফিলতি ছিল। বেছে বেছে ভুয়ো নাম বাদ দেওয়া হবে।”
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের একাধিক অ্যাকাউন্ট পুনরায় খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে লিঙ্গ, বয়স বা পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে, সেগুলিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে যাচাই করা হচ্ছে।
এই ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে সরকারি প্রকল্পে তথ্য যাচাই ও ডেটা ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া নিয়ে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে দায় চাপানোর পালা। এখন তদন্তে কী উঠে আসে, সেটাই দেখার।