নিজস্ব সংবাদদাতা:
প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের কুঠুরি যেন পরিণত হয়েছিল অপরাধ জগতের ‘কমান্ড সেন্টার’-এ। জেলের ভিতর বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে রাজ্য থেকে ভিনরাজ্য পর্যন্ত অপরাধচক্র পরিচালনার অভিযোগে তোলপাড় প্রশাসনিক মহল। শুক্রবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
তিনি জানান, প্রেসিডেন্সি জেলের বিভিন্ন সেল, ফাঁকফোকর এবং গোপন জায়গা থেকে উদ্ধার হয়েছে মোট ২৩টি মোবাইল ফোন, যার মধ্যে একটি স্মার্টফোনও রয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেল প্রশাসনের গাফিলতির অভিযোগে প্রেসিডেন্সি জেলের সুপার এন কুজুর এবং চিফ কন্ট্রোলার দীপ্ত ঘড়ুইকে সাসপেন্ড করেছে রাজ্য সরকার।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, একাধিক নির্যাতিত পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ আসে যে, কুখ্যাত অপরাধীরা জেলের ভিতর বসেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বাইরে অপরাধচক্র চালাচ্ছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্তে নামে প্রশাসন। রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল ও স্বরাষ্ট্রসচিব সংঘমিত্রা ঘোষের তত্ত্বাবধানে কারা দপ্তরের ডিজি এন রমেশবাবু এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ প্রেসিডেন্সি জেলে বিশেষ অভিযান চালান।
জেলের ভিতরেই ‘ডিজিটাল নেটওয়ার্ক’
তদন্তে উঠে এসেছে, ছোট আকারের সাধারণ মোবাইল ফোনই বেশি ব্যবহার করা হতো যাতে সহজে লুকিয়ে রাখা যায়। জেলের ঘুলঘুলি, দেওয়ালের ফাঁক এবং অন্যান্য গুপ্ত জায়গা থেকে এই ফোনগুলি উদ্ধার হয়।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বছরের পর বছর ধরে এই নেটওয়ার্ক চলছিল। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পরিবর্তনের সরকার সেই সিস্টেম ভাঙার কাজ শুরু করেছে।”
যদিও নির্দিষ্ট কোনও বন্দির নাম প্রকাশ্যে বলেননি মুখ্যমন্ত্রী, তবে সন্দেশখালির শেখ শাহজাহানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, কল ডিটেইলস খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “শাহজাহান কার কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত, কোনও মন্ত্রী বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়েছে কি না, সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” এছাড়াও, জেলবন্দিদের সঙ্গে যারা নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ রাখতেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
গোটা ঘটনার তদন্তভার CID-কে দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, “আমাদের রাজ্যের পুলিশ দক্ষ ছিল, কিন্তু তাদের কাজ করতে দেওয়া হতো না।” অভিযোগ পাওয়ার মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যেই অভিযান সম্পন্ন হয় বলেও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত দাগী অপরাধীদের আলাদা সেলে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “রাজ্যের কোনও সংশোধনাগারেই আর অপরাধীদের মোবাইল নেটওয়ার্ক চলতে দেওয়া হবে না। যারা এই মোবাইল সরবরাহ করছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” প্রেসিডেন্সি জেলের এই ঘটনায় রাজ্যের কারা ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।