ইস্তফা দিয়ে অধীরকে খোলা চ্যালেঞ্জ নাড়ুগোপালের

নিউজ ফ্রন্ট, বহরমপুরঃ

বহরমপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরেই সাংবাদিক বৈঠক করে কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীকে খোলা মঞ্চে চ্যালেঞ্জ জানান নাড়ুগোপাল মুখার্জি। অধীর চৌধুরী তাঁর বিরুদ্ধে যে দুবাইয়ে টাকা পাচার (সাইফন) এবং শাশুড়ির নামে বেআইনিভাবে মিউনিসিপ্যালিটির কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন, তা সম্পূর্ণ ‘মিথ্যাচার’ বলে উড়িয়ে দেন নাড়ুগোপাল।

তিনি সাফ জানান “আমি চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে গিয়ে সাধারণ সদস্য হিসেবে থাকলাম। এবার এসডিও বা অন্য কোনো অ্যাডমিনিস্ট্রেটর এসে তদন্ত করে দেখুক, সত্য সামনে চলে আসবে।” অধীর চৌধুরীকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে তিনি বলেন, গত ৩ মাস ধরে যে সস্তা রাজনীতি করা হচ্ছে, তার সপক্ষে অধীর বাবু একটিও আইনি নথি (Document) দেখাতে পারেননি।

অধীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে লুটের সাম্রাজ্যও খুনের মারাত্মক অভিযোগ

পাল্টা আক্রমণ শানিয়ে নাড়ুগোপাল মুখার্জি দাবি করেন, বিগত ১৮ বছর ধরে বহরমপুর পৌরসভায় অধীর চৌধুরী যে দুর্নীতি করেছেন, তার সমস্ত নথি তাঁর কাছে রয়েছে। তিনি বেশ কিছু বিস্ফোরক তথ্য ও দলিল সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন:

  • বেআইনি পুকুর ভরাট ও বাগানবাড়ি: ২০১৩ সালের একটি দলিলের নম্বর (২৭৩৯) দেখিয়ে তিনি দাবি করেন, ল্যান্ড ফিশারি অ্যাক্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের রুলিং লঙ্ঘন করে অধীর চৌধুরী নিজের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এক বিঘার বেশি (৪৩ ডেসিমোল) একটি পুকুর ভরাট করে ভিটি জমিতে রূপান্তর করেছেন। ১৯৯৮ সালে তাঁর ৩ বিঘের বাগানবাড়ি আজ বেড়ে ৯ বিঘে হয়েছে।
  • লালন এনজিওকেলেঙ্কারি: ২০১২-১৩ সালে নো-প্রফিট নো-লস নিয়মের তোয়াক্কা না করে ‘লালন সেবা সমিতি’ নামক একটি এনজিও-কে দিয়ে বহরমপুর পৌরসভায় ৭৮ লক্ষ টাকার টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া হয় এবং নামে মাত্র কাজ করে ভুয়ো বিল তোলা হয়।
  • ব্যক্তিগত গাড়ি ও ক্যাশ ডিপোজিট: ২০০৯ সালে তৎকালীন চেয়ারম্যান নীলরতন আঢ্যকে চাপ দিয়ে পৌরসভা থেকে ৪০ লক্ষ টাকা নিয়ে ‘পেজারো’ গাড়ি কেনেন অধীর বাবু। এছাড়া ২০১২ সালে জলট্যাঙ্কির পাশের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে পৌরসভা থেকে টাকা নিয়ে ৫০-৬০ লক্ষ টাকা ক্যাশ ডিপোজিট করার অভিযোগও তোলেন তিনি।
  • কাটমানি ও পিএফ-গ্র্যাচুইটি তছরুপ: প্রতি মাসে ৪০-৫০ লক্ষ টাকা কাটমানি নেওয়ার ফলে পৌরসভার ভাঁড়ার শূন্য হয়ে পড়ে। যার জেরে কর্মচারীদের ১১-১২ কোটি টাকার গ্র্যাচুইটি আউটস্ট্যান্ডিং রয়েছে এবং ২০০৬ সাল থেকে পিএফ-এর টাকা জমা দেওয়া হয়নি।
  • ভোটের খরচের নামে টাকা ধার: ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ‘বাবন’ নামক এক ব্যক্তির মারফত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সত্তর লক্ষ (৭০ লক্ষ) টাকা ধার নিয়েছিলেন অধীর চৌধুরী, যা তিনি আজও ফেরত দেননি। নাড়ুগোপাল জানান, এই টাকা ফেরত না দিলে তিনি সিআইডি এবং পুলিশের কাছে এফআইআর করবেন।
  • খুনের রাজনীতির ফাইল খোলার হুঁশিয়ারি: অতীতে সিপিএম এবং তৃণমূল কর্মীদের খুনের পেছনে অধীর চৌধুরীর নির্দেশ ছিল দাবি করে নাড়ুগোপাল বলেন, সাক্ষীদের ম্যানেজ করে অধীর বাবু পার পেয়েছিলেন। সেই সমস্ত ফাইলও তিনি নতুন করে আদালতে খুলবেন।

 ‘টাকা যাচ্ছে দুবাই‘, পাল্টা সুর চড়ালেন অধীর চৌধুরী

নাড়ুগোপাল মুখার্জির এই সমস্ত অভিযোগের জবাবে পাল্টা সুর চড়িয়েছেন বহরমপুরের বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী। তৃণমূলের বিদায়ী চেয়ারম্যানের ইস্তফাকে ‘চোরের মায়ের বড় গলা’ বলে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, বাংলায় এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে তৃণমূল লুটপাট আর ডাকাতি করেনি।

অধীর চৌধুরীর বলেন “আমি দিল্লি থেকে বহরমপুরের ডাম্পিং গ্রাউন্ডের (Dumping Ground) জন্য যে টাকা স্যাঙ্কশন করিয়ে এনেছিলাম, সেই কোটি কোটি টাকার কাজ নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিদায়ী চেয়ারম্যানের শাশুড়িকে পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। সামান্য টাকার বিনিময়ে পুরো শহর তছনছ করা হয়েছে। এখানে টাকা রাখার জায়গা নেই, তাই সেই দুর্নীতির টাকা সাইফন হয়ে চলে যাচ্ছে দুবাইয়ে।”

একই সাথে অধীর বাবু ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, বহরমপুর বা কান্দি পৌরসভা নিয়ে বিজেপি কেন চুপ করে আছে? সেখানেও শয়ে শয়ে ক্যাজুয়াল লেবারের নামে তৃণমূল নেতারা মিথ্যে ভুয়ো বিল বানিয়ে টাকা রোজগার করছে। তিনি এই দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীর সাজার দাবি জানান।

২০০৮ থেকে স্পেশাল অডিটের দাবি, ময়দানে বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্র

বহরমপুর পৌরসভার এই কাদা ছোড়াছুড়ি এবং চেয়ারম্যানের পদত্যাগের পরই ময়দানে নেমেছে বিজেপি। বহরমপুরের বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্র বিধানসভা অধিবেশনের প্রথম দিনই রাজ্যের পৌর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে একটি চিঠি লিখেছেন।

চিঠিতে তিনি ২০০৮ সাল থেকে বহরমপুর পৌরসভার সমস্ত কাজের একটি বিশেষ অডিটের (Special Audit) দাবি জানিয়েছেন। অর্থাৎ, তৃণমূল জমানার পাশাপাশি অধীর চৌধুরীর কংগ্রেস বোর্ডের জমানাকেও এই তদন্তের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন তিনি।

সামাজিক মাধ্যমে এই চিঠির প্রতিলিপি পোস্ট করে বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্র কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন “ছাড় কেউ পাবে না নিশ্চিত থাকুন, দুর্নীতির শিকড়টা একদম গোড়া থেকে তুলে ফেলার যাবতীয় বন্দোবস্ত করার চেষ্টাই করে চলেছি। আজ বিধানসভা অধিবেশনের প্রথম দিনই সেই কাজটা এগিয়ে রাখলাম। আরো অনেক কিছু দেখতে পাবেন, একটু অপেক্ষা করুন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *