রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে বাদ প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম! মুর্শিদাবাদেই কাটা গেল পৌনে ৩ লক্ষ

নিউজ ফ্রন্ট, কলকাতা ও বহরমপুর:

ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) মঙ্গলবার রাজ্যে বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনের (Special Intensive Revision বা SIR) খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত সেই খসড়া তালিকায় দেখা যাচ্ছে এক নজিরবিহীন চিত্র। রাজ্যজুড়ে এক ধাক্কায় ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। যা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে চাপানউতোর।

কমিশন সূত্রে খবর, রাজ্যে মোট ভোটার সংখ্যা আগে ছিল সাড়ে ৭ কোটির বেশি। কিন্তু মঙ্গলবার প্রকাশিত খসড়া তালিকায় তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৮ লক্ষে। অর্থাৎ, ব্যাপক ঝাড়াই-বাছাইয়ের পর সংখ্যাটি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

মূলত চারটি ক্যাটাগরিতে এই নামগুলি বাদ দেওয়া হয়েছে, যাকে কমিশনের পরিভাষায় বলা হচ্ছে ‘ASDD’: Absent (অনুপস্থিত): দীর্ঘসময় ধরে এলাকায় অনুপস্থিত। Shifted (স্থানান্তরিত): ১৯ লক্ষ মানুষ যারা অন্য জায়গায় বা রাজ্যে স্থায়ীভাবে চলে গেছেন। Dead (মৃত): ২৪ লক্ষ মৃত ভোটারের নাম। Duplicate (ডুপ্লিকেট): ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ভুয়ো বা একাধিক জায়গায় নাম থাকা ভোটার। এছাড়াও প্রায় ১২ লক্ষ ভোটারের কোনো খোঁজই পাওয়া যায়নি।

শুধু নাম বাদ দেওয়াই নয়, ভোটার তালিকার তথ্যে গরমিল বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র (Logical Discrepancy) কারণে রাজ্যে প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একই ব্যক্তির ৬টির বেশি কার্ড থাকা, ২০০২ সালের তথ্যের সঙ্গে বাবার নামের অমিল, কিংবা বয়সের অসামঞ্জস্য। এই অসঙ্গতিগুলি যাচাই করার জন্য রাজ্যজুড়ে প্রায় ৩২ লক্ষ মানুষকে শুনানির জন্য নোটিশ পাঠানো হচ্ছে।

সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলায় এই বিশেষ সংশোধনের প্রভাব পড়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে পূর্বের ভোটার ছিল ৫৭ লক্ষ ৬৪ হাজার ৮৫ জন। বর্তমান খসড়া ভোটার তালিকায় সেটা হয়েছে ৫৪ লক্ষ ৮৫ হাজার ২৪৮ জন। মোট বাদ গেছে ২ লক্ষ ৭৮ হাজার ৮৩৭ জন। ১ লক্ষ ২১ হাজার ৫৯৬ জন ভোটারকে ‘আনম্যাপিং’ বা অসঙ্গতির কারণে শুনানির জন্য ডাকা হচ্ছে।

কোথায় কত নাম বাদ পড়ল? (মুর্শিদাবাদ জেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যান):

জেলায় সবচেয়ে বেশি নাম বাদ গেছে বহরমপুর বিধানসভা এলাকায়। এক নজরে পরিসংখ্যান:

ক্রমিকবিধানসভা কেন্দ্রবাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা
১বহরমপুর১৯,৯২৪
২শমসেরগঞ্জ১৬,৮৪১
৩সুতি১৬,১৯২
৪ফরাক্কা১৬,১৩৮
৫রঘুনাথগঞ্জ১৫,৭৬০
৬ভরতপুর১৪,২৪০
৭মুর্শিদাবাদ১৩,৮২২
৮সাগরদিঘি১৩,৮১৪
৯রেজিনগর১৩,৭৫১
১০বেলডাঙা১৩,৩৮৮
১১কান্দি১২,৭৫৯
১২লালগোলা১২,৫৬৭
১৩জঙ্গিপুর১১,৭৫০
১৪খড়গ্রাম১০,৯৮৪
১৫বড়ঞা১০,৭৯৯
১৬ভগবানগোলা৯,৯১২
১৭নওদা৯,৮৩৩
১৮নবগ্রাম৯,৮১৯
১৯ডোমকল৯,৪৮৯
২০হরিহরপাড়া৯,২৪৫
২১জলঙ্গি৯,১২৪
২২রানিনগর৮,৬৮৬
মোটসমগ্র জেলা২,৭৮,৮৩৭

তথ্যসূত্র: জেলা নির্বাচন দফতর, মুর্শিদাবাদ।

মঙ্গলবার খসড়া তালিকা প্রকাশের পরই মুর্শিদাবাদ জেলা শাসক নিতিন সিংহানিয়ার উপস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে একটি সর্বদলীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বহরমপুর-মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অপূর্ব সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নামের বানান বা পদবিতে সামান্য ভুলের জন্য লক্ষাধিক মানুষকে নোটিশ পাঠিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।” পাশাপাশি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিজেপিকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “বাদ পড়া নামের মধ্যে কতজন রোহিঙ্গা, তার তালিকা বিজেপি প্রকাশ করুক। জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অসীম কুমার রায় জানান, “যাদের নাম বাদ গেছে তাদের তালিকা কমিশন দিচ্ছে না। আমরা দাবি জানিয়েছি যেন কোনো যোগ্য ভোটারের নাম বাদ না যায়।” জেলা সভাপতি মলয় মহাজন পাল্টা বলেন, “প্রায় পৌনে তিন লক্ষ নাম বাদ গেছে। এর মধ্যে কে রোহিঙ্গা আর কে নয়, তা আমরা কী করে বাছাই করব? এটা প্রশাসনের কাজ।” সিপিআইএম ও ফরওয়ার্ড ব্লকের তরফে মৃত ও ডুপ্লিকেট ভোটারদের আলাদা তালিকা এবং শুনানির স্বচ্ছতার দাবি জানানো হয়েছে।

খসড়া তালিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই দাবি ও আপত্তি জানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। যাদের নাম বাদ গেছে বা যাদের তথ্যে অসঙ্গতি রয়েছে, তাদের নোটিশ পাঠানো শুরু হয়েছে। আগামী ৭ দিন পর থেকে শুরু হবে শুনানি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এই যাচাই পর্ব চলবে এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *