‘ভোট লুট রুখতে পারলাম না, মাথা নত করতে হলো’; ক্যামেরার সামনে কেঁদে ফেললেন হুমায়ুন
নিজস্ব প্রতিনিধি, রেজিনগর:
রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনের পরের দিনেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন ফেলে সংসদীয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর চূড়ান্ত ঘোষণা করলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান তথা নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। ভোটকেন্দ্রে ‘ভোট লুট’ রুখতে না পারার অক্ষমতা এবং খোদ পুলিশের হাতে নিগৃহীত হওয়ার গভীর যন্ত্রণায় ক্যামেরার সামনে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন—গণতন্ত্রকে হত্যা করার প্রতিবাদে তিনি বিধানসভার ৮৮ নম্বর আসন ও যাবতীয় কার্যবিবরণী বয়কট করছেন। একই সঙ্গে দুর্গাপূজা মিটলেই নওদার মানুষের সঙ্গে বৈঠক করে নিজের বিধায়ক পদ থেকেও ইস্তফা দেওয়ার চরম সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন তিনি।

সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে ৬৪ বছর বয়সী প্রবীণ এই রাজনৈতিক নেতা বলেন
“আমি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে বেঁচে থাকার মানুষ নই। কোনোদিন অন্যায়ের কাছে কিংবা বাবার কাছেও মাথা নত করিনি। কিন্তু রেজিনগরে পুলিশ ও প্রশাসনের ক্ষমতা দেখিয়ে যেভাবে ভোট লুট হলো, আমি তার মোকাবিলা করতে পারলাম না। একজন বিধায়ককে তাঁর পার্টি অফিস থেকে টেনে-হিঁচড়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো, পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর গায়ে হাত তুলল—এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কিছু হতে পারে না। এই অবিচারের কাছে আমাকে মাথা নত করতে হলো, এই যন্ত্রণা থেকেই চোখে জল আসছে।”
বিধানসভা ও সংসদীয় কমিটি পূর্ণ বয়কট
হুমায়ুন কবীর ঘোষণা করেন, বর্তমান প্রশাসনের কার্যকলাপের প্রতিবাদে তিনি বিধানসভা কার্যক্রম বয়কট করছেন স্পিকারের বরাদ্দ করা তাঁর ৮৮ নম্বর আসনটি খালিই থাকবে। যেদিন মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় উপস্থিত থাকবেন, সেদিন তিনি হাউসে ঢুকবেন না, বড়জোর লবিতে বসে থাকবেন। বিধানসভার বিজনেস অ্যাডভাইজারি কমিটি, স্ট্যান্ডিং কমিটি এবং হাউস কমিটির সমস্ত বৈঠক তিনি সরাসরি বয়কট করছেন। রেজিনগরের উপনির্বাচনের ভোট গণনা কেন্দ্রেও তাঁর দলের কোনো প্রতিনিধি পা রাখবে না।

নওদার মানুষের মতামত নিয়ে বিধায়ক পদে ইস্তফার হুঁশিয়ারি
বিধায়ক পদ ত্যাগ প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবীর জানান, দুর্গাপূজা মিটলেই তিনি নওদায় এক বিশাল জনসভা করবেন। সেখানে উপস্থিত জনতার অন্তত ৬০ শতাংশ মানুষ যদি তাঁর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন, তবে তিনি নওদার বিধায়ক পদেও ইস্তফা দেবেন। উল্লেখ্য, এর আগে তিনি ২০১২ সালে কংগ্রেস, ২০২৬-এর ৩০ মার্চ তৃণমূল এবং ১৫ মে বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। নওদা থেকে পদত্যাগ করলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে তা হবে চতুর্থবারের পদত্যাগ।
‘সংসদীয় রাজনীতিতে আর নয়, তবে প্রতিবাদ চলবে‘
দীর্ঘ ৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ইতি টানার কথা স্পষ্ট করে হুমায়ুন কবীর বলেন, “আমি সংসদীয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি, কিন্তু সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই থামবে না। চোখের সামনে পুলিশ বা যে কারও অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করে যাব।” সবশেষে রেজিনগরকে নিয়ে দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে চাঁচাছোলা আক্রমণ করেন। তাঁর খোঁচা, “আপনি তো ১ তারিখে প্রজা সংঘের মাঠে দাঁড়িয়ে রেজিনগরকে ‘মডেল’ বানানোর কথা বলেছিলেন, ১ লাখ চাকরি আর আম্বানির কারখানা আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এবার অন্তত সেই কথা রাখবেন। রেজিনগরের মানুষের ভোট লুট করে বিধায়ক বানিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষকে আর প্রতারিত করবেন না।”