নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর ও রেজিনগর:
ফল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ পৌঁছাল চরমে। বহিরাগত হয়েও ভোটকেন্দ্রে ঢুকে স্বয়ং বিজেপি প্রার্থী সাখারভ সরকার বুথের গোপন কক্ষে গিয়ে ইভিএমে হাত দিচ্ছেন—এমনই একটি বিতর্কিত মোবাইল ফুটেজ সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই বিরোধীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ল পদ্মশিবির। ভোট বাতিলের দাবিতে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে কংগ্রেস। পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলেছেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীর। যদিও সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে একে ‘পরাজয়ের আর্তনাদ’ বলে পাল্টা জবাব দিয়েছেন বিজেপি প্রার্থী।

‘নির্বাচন নয়, ব্যভিচার হয়েছে’: গণনা বন্ধের দাবি মনোজ চক্রবর্তীর
ভিডিয়োটি প্রকাশ্যে আসার পরই বহরমপুরে জরুরি সাংবাদিক বৈঠক ডাকেন কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী মনোজ চক্রবর্তী। সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন:
“রেজিনগরে যা হয়েছে তা ভূভারতে কোনোদিন দেখা যায়নি। যে ভিডিয়ো সামনে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে সরকারি দলের প্রার্থী নিজে বুথের ভেতর ইভিএমের কাছে ঢুকেছেন এবং সেখান থেকে মেশিনের আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছে। এটা নির্বাচন নয়, নির্বাচনের নামে ব্যভিচার ও জালিয়াতি হয়েছে। আমরা নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ ও ফুটেজ জমা দিচ্ছি। অবিলম্বে এই ভুয়ো নির্বাচন বাতিল করতে হবে এবং গণনার কাজ স্থগিত রাখতে হবে।”
‘ভোট লুণ্ঠনের ছক করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী’: বিস্ফোরক কংগ্রেস প্রার্থী
কংগ্রেস প্রার্থী আব্দুল লাহিল কাফি সরাসরি রাজ্য প্রশাসন ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, “বহরমপুরের বাসিন্দা সাখারভ সরকারের রেজিনগরে ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। অথচ ১২ নম্বর মজলিসপুর রুরাল লাইব্রেরি বুথে গিয়ে তিনি ইভিএমে বারবার হাত দিয়েছেন। পুলিশ প্রশাসন ও এসপি-র মদতেই সকাল ৯টা থেকে নীরবে ভোট লুণ্ঠন হয়েছে। কার কত শতাংশ ভোট পড়বে, তা আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।” নির্বাচন কমিশনের কাছে সাখারভ সরকারের প্রার্থীপদ বাতিল ও পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সেক্টর অফিসারকে বরখাস্ত ও পুনর্নির্বাচনের দাবি হুমায়ুন কবীরের
আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা তথা নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর নিজের সমাজমাধ্যমে বিতর্কিত ফুটেজটি পোস্ট করে পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। কামনগর অঞ্চলের ১২ নম্বর মজলিসপুর বুথে বহিরাগত বিজেপি প্রার্থী কীভাবে অবাধে ঢুকে এই ঘটনা ঘটালেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট বুথের সেক্টর অফিসার ও ভোটকর্মীদের বরখাস্ত করার পাশাপাশি পুনর্নির্বাচনের দাবি জানান হুমায়ুন।
‘মেশিন দেখতে গিয়েছিলাম, হাত পেছনে ছিল’: আত্মপক্ষ সমর্থনে সাখারভ
সমস্ত অভিযোগ এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন বিজেপি প্রার্থী সাখারভ সরকার। তাঁর বক্তব্য:
“এসবই বিরোধীদের পরাজয়ের আর্তনাদ। গণনা হলেই ওদের ভরাডুবি হবে জেনেই এই নাটক। বুথে ইভিএম খারাপ হওয়ার খবর পেয়ে প্রিসাইডিং অফিসারকে (পিআইডি) সঙ্গে নিয়েই আমি সেখানে যাই। ভিডিয়োটি ভালো করে দেখলেই বোঝা যাবে, আমার দুটি হাত পেছনের দিকে রাখা ছিল। আমি ইভিএমে হাতও দিইনি, কোনো ভোটারকে প্রভাবিতও করিনি। সারা জীবন অনৈতিক কাজ করিনি, আজও করব না। জনগণ ব্যালটে ওদের যোগ্য জবাব দিয়েছে।”
কড়া নিরাপত্তায় দুই কেন্দ্রে ১৫ রাউন্ডে ভোট গণনা
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের আবহেই শুক্রবার সকাল থেকে রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম—দুই হাইভোল্টেজ কেন্দ্রে শুরু হচ্ছে ভোট গণনা। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে বহরমপুর গার্লস কলেজে দুটি পৃথক হলে মোট ১৫ রাউন্ডে গণনা হবে। কবি সুকান্ত সেকেন্ডারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে দুটি হলে ১৫ রাউন্ডে গণনা সম্পন্ন হবে। এই কেন্দ্রে মোট ভোট পড়েছে ৮০.৮৯ শতাংশ। গণনাকেন্দ্রের ১০০ মিটারের মধ্যে ‘পেডেস্ট্রিয়ান জোন’ বা পথচারী এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। স্ট্রং রুম থেকে গণনাকেন্দ্র পাহারা দিচ্ছে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশের ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়।