হুমায়ুনের ‘মৃত্যুকামনা’র জবাব জনতার ওপর ছেড়ে দিয়ে শিল্প, স্বাস্থ্য ও দুগ্ধচাষীদের জন্য বড় প্যাকেজ; ৬ অক্টোবর পদ্ম চিহ্নে ভোট দিয়ে সাকারফ সরকারকে জেতানোর ডাক
‘নন্দীগ্রামের মতোই সাজাব রেজিনগর, দেড় বছরে শিল্পতালুকে কলকারখানার ধোঁয়া উড়বে!’ শক্তিপুরের সভা থেকে বিরোধীদের চূর্ণ করে মেগা প্রতিশ্রুতি শুভেন্দু অধিকারীর
নিজস্ব প্রতিনিধি, রেজিনগর:
আসন্ন রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনে রাজনৈতিক উত্তাপের পারদ এক ধাক্কায় শিখরে পৌঁছে দিয়ে শক্তিপুরের প্রতাপ সিংহ মাঠে অনুষ্ঠিত সুবিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সভায় বিজেপি প্রার্থী সাখারভ সরকারের সমর্থনে নির্বাচনী প্রচারে এসে একদিকে যেমন বিরোধী শিবিরের যাবতীয় আক্রমণ ও হুমায়ুন কবীরের ‘মৃত্যুকামনা’র কড়া রাজনৈতিক জবাব দিলেন, অন্যদিকে রেজিনগরের সার্বিক রূপরেখা বদলে দিতে একগুচ্ছ পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান ও সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পের ঘোষণা করলেন তিনি।
জনসভায় প্রবেশের আগে মুখ্যমন্ত্রী দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ৬ বছরের শিশু জাসমিনা খাতুনের শোকস্তব্ধ পরিবারের সাথে দেখা করেন এবং ঐতিহাসিক মীর মদনের সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি জানান, নির্বাচনী আচরণবিধি উঠে গেলেই শোকসন্তপ্ত পরিবারটির পাশে রাজ্য সরকার সর্বতোভাবে দাঁড়াবে।

‘মৃত্যুকামনাকারীদের বিচার করবে রেজিনগরের জনতা’: হুমায়ুনকে তীব্র তোপ
বক্তব্যের শুরুতেই নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের সাম্প্রতিক বিতর্কিত মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন
“আমরা রাজনৈতিক শত্রু হলেও মুখে কখনও এই ধরনের ভাষা আনি না। রাজনীতিতে তর্ক হবে, বিতর্ক হবে, জয়-পরাজয় থাকবে। আর এখানে উনি বলছেন প্রতি শুক্রবারে উপরওয়ালার কাছে মোনাজাত করবেন যাতে আমাকে পৃথিবী থেকে তুলে নেওয়া হয়! এই ভাষার বিচার রেজিনগরের গণদেবতার উপরেই ছেড়ে দিয়ে গেলাম। যিনি অধীর চৌধুরীকে ছুরি মেরেছেন, বিজেপি ও মুকুল রায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, তাঁর অহংকারের পতন নিশ্চিত।”
রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, বিধানসভায় সিপিএম একটি এবং কংগ্রেস মাত্র দুটি আসনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্তর্দ্বন্দ্বে দল ভেঙে আজ ‘মমতাই টিসি’ এবং ‘ডিটিএমসি’তে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতি, বঞ্চনা ও হিংসার রাজনীতি রাজ্য থেকে পুরোপুরি মুছে যাওয়ার পথে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
৫ মাসের খতিয়ান ও রেজিনগরের জন্য উন্নয়নের খতিয়ান
রেজিনগর এতদিন বিজেপির আসন না থাকা সত্ত্বেও গত পাঁচ মাসে এই অঞ্চলের জন্য কী কী উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী:
• স্বাস্থ্য সুরক্ষা (আয়ুষ্মান ভারত): রেজিনগরের প্রায় ৪০,০০০ পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা মাথায় রেখে ভিনরাজ্যেও বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য ২ লক্ষ ১ হাজার ৫৫৫ জনকে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ (৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসা) কার্ড প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি ৮,৯০৮ জনকে রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য বিমার আওতাভুক্ত করা হয়েছে।
• প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা: বিগত বাম ও তৃণমূল জমানায় ঘর না পাওয়া দরিদ্র মানুষদের চিহ্নিত করে দলমত নির্বিশেষে রেজিনগরে ১৬,০৫১ জনের পাকা বাড়ির তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
• অন্নপূর্ণা যোজনা: এলাকার ৭০,০০০ মহিলাকে এই প্রকল্পের আর্থিক সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, বিজেপির বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা ব্যর্থ করে এর মধ্যে ৩৫,০০০ সংখ্যালঘু মহিলা ইতিমধ্যেই সরাসরি তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩,০০০ টাকা করে পেয়েছেন।
• সামাজিক সুরক্ষা ভাতা বৃদ্ধি: রেজিনগরের ৪৮,৩৬৯ জন বার্ধক্য, বিধবা ও দিব্যাঙ্গ ভাতা প্রাপকের মাসিক ভাতা ১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৫০০ টাকা করা হয়েছে।
ভাঙাচোরা রাস্তার সংস্কার ও পরিকাঠামো উন্নয়ন
বিগত বিধায়কদের আমলে রেজিনগরের গ্রামীণ রাস্তার বেহাল দশার কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, পুজো ও মহালয়ার আগেই একাধিক রাস্তার সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে:
- শক্তিপুর হাসপাতাল থেকে ষষ্ঠীতলা (শক্তিপুর জিপি, বেলডাঙা-২): জেলা পরিষদের মাধ্যমে ২৭ লক্ষ ৭২ হাজার টাকা ব্যয়ে রাস্তা মেরামতের কাজ চলছে।
- দাঁদপুর বেলতলা থেকে দাঁদপুর হাইস্কুল: ৪০ লক্ষ ২২ হাজার টাকার কাজ শুরু হয়েছে।
- রামপাড়া হাইস্কুল থেকে নারকেলবাড়ি ফেরিঘাট: ১ কোটি ৭ লক্ষ ৭১ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
- রামনগর বাজার ও চৌগাছিয়া সংলগ্ন রাস্তা: পূর্ত দফতরের (PWD) মাধ্যমে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাজ শুরু হচ্ছে।
রেজিনগরের জন্য কি কি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
রেজিনগরকে নিজের বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রাম ও কলকাতার ভবানীপুরের ধাঁচে একটি ‘মডেল বিধানসভা’ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন:
• স্বাস্থ্য পরিকাঠামো: শক্তিপুর হাসপাতালে এক্স-রে, স্ক্যান ও এমআরআই (MRI) সুবিধাসহ পূর্ণাঙ্গ ২০০ শয্যার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল এবং প্রধানমন্ত্রী জনৌষধি কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
• রেজিনগর শিল্পতালুক ও কর্মসংস্থান: ফলতার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (SEZ) মতো রেজিনগর শিল্পতালুককে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। ইতিমধ্যেই ৪টি শিল্প প্রস্তাব এসেছে। আগামী দেড় বছরের মধ্যে কারখানার কাজ শুরু হবে, যাতে বাইরে থাকা ৪০,০০০ পরিযায়ী শ্রমিক নিজভূমে ফিরে এসে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান।
• ১০০ দিনের কাজ ও কৃষক সহায়তা: আগামী ৬ মাসে ১২৫ দিনের কাজের নিশ্চয়তা দিয়ে ৩৪,৫০০ টাকা (দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরি) এবং পিএম-কিষাণ ও কৃষকবন্ধুর আওতায় কৃষকদের সহায়তা আরও বৃদ্ধি করা হবে।
• দুগ্ধচাষীদের জন্য ‘আমুল’ নেটওয়ার্ক: রেজিনগর ও বেলডাঙায় আমুলের ৫টি বড় দুধ কালেকশন সেন্টার খোলা হবে। রাজ্য সরকার যেখানে প্রতি লিটার দুধে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দেয়, আমুল সরাসরি কৃষকদের থেকে ৪৫ টাকা দরে দুধ কিনবে। রাস্তায় পুলিশি তোলাবাজি বন্ধের পাশাপাশি রেলের মাধ্যমে দুগ্ধজাত পণ্য পরিবহণে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হবে।
বক্তব্যের শেষে তিনি রেজিনগরের জনগণকে আহ্বান জানান, আগামী ৬ অক্টোবর ৩ নম্বর বোতামে (পদ্মফুল প্রতীকে) ভোট দিয়ে বিজেপি প্রার্থী সাখারভ সরকারকে বিপুল ভোটে জয়ী করে বিধানসভায় পাঠাতে।