নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: রাজ্যে পালাবদলের পর পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরে বড়সড় রদবদলের ইঙ্গিত দিলেন নয়া মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে গ্রাম বাংলার উন্নয়নের চাকা ঘোরাতে এবার সরাসরি ময়দানে নামছেন তিনি। দপ্তর পরিদর্শনে গিয়ে তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা— “শুধুমাত্র সচিবালয়ে বসে নয়, এবার জেলায় জেলায় গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হবে।”
দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার উত্তীর্ণ প্রার্থীর নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। দিল্লির সঙ্গে সমন্বয় রেখে আটকে থাকা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা রাজ্যে নিয়ে আসা। এসি ঘরে বসে নয়, জেলাস্তরে গিয়ে সরাসরি কাজের তদারকি করবেন মন্ত্রী নিজে। দুর্নীতির মূলোৎপাটন এবং তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তর পরিদর্শনে যান দিলীপ ঘোষ। সেখানে উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি দপ্তরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, রাজ্য সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দপ্তরটি বর্তমানে কর্মী স্বল্পতা এবং পরিকল্পনাহীনতার কারণে ধুঁকছে। প্রায় সাড়ে ছয় হাজার প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়ে থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের নিয়োগ ঝুলে রয়েছে, যা দপ্তরের কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে।
২০১১ সালে পরিবর্তনের সরকারের প্রথম পঞ্চায়েত মন্ত্রী প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, “বামেরা যদি ৫০ শতাংশ কাজও করত, তবে আমরা ক্ষমতায় আসতাম না।” কাকতালীয়ভাবে, ১৫ বছর পর রাজ্যে ফের পালাবদলের পর সেই একই প্রতিধ্বনি শোনা গেল দিলীপ ঘোষের গলায়। তিনি অভিযোগ করেন, সুব্রত বাবুর পরবর্তী সময়ে দপ্তরের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা অপব্যবহার হয়েছে এবং সঠিক সময়ে ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট জমা না দেওয়ায় বন্ধ হয়েছে দিল্লির বরাদ্দ।
দিলীপ ঘোষ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, পঞ্চায়েত দপ্তর মূলত কেন্দ্রীয় অনুদান বা ‘লাইন ডিপার্টমেন্ট‘-এর ওপর নির্ভরশীল। ১০০ দিনের কাজ (MGNREGA), প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা (PMGSY), আবাস যোজনা (PMAY) এই প্রকল্পগুলির সিংহভাগ টাকাই আসে কেন্দ্র থেকে। রাজ্যে এখন ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার থাকায় দিল্লির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আটকে থাকা তহবিল দ্রুত ছাড় করানোর বিষয়ে তিনি আশাবাদী। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের সঙ্গে এই বিষয়ে তাঁর প্রাথমিক কথা হয়েছে বলে তিনি জানান।
সরকারি আধিকারিকদের একাংশের মতে, বিগত কয়েক বছরে গ্রামোন্নয়নের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ। এক খাতের টাকা অন্য খাতে সরানো বা কাটমানি সংস্কৃতির কারণে গ্রাম বাংলার প্রকৃত উন্নয়ন থমকে ছিল। মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ সাফ জানিয়েছেন, “পঞ্চায়েত না চললে গ্রামের বিকাশ অসম্ভব। আগামী ক্যাবিনেট বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সমস্ত কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
রাজনৈতিক মহলে দিলীপ ঘোষের পরিচিতি একজন ‘দাবাং’ নেতা হিসেবে। তাঁর এই কড়া মেজাজ এবং সরাসরি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ পঞ্চায়েত দপ্তরের ঝিমিয়ে পড়া কাজকর্মে গতি আনবে বলেই মনে করছেন দপ্তরের আধিকারিক ও কর্মীরা।