নিজস্ব সংবাদদাতা, বহরমপুর:
বহরমপুরের গোরাবাজার নিমতলা মোড়ে এসইউসিআই (SUCI)-এর বইয়ের স্টল ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে জেলা জুড়ে। একদিকে যখন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদ জানিয়ে নিজের অর্থে হাজার হাজার টাকার বই কিনে সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন এক বিশিষ্ট চিকিৎসক, অন্যদিকে তেমনই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যে অসহিষ্ণুতা ও ‘বুলডোজার রাজ’-এর বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী।
উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর রাতের অন্ধকারে নিমতলা মোড়ের ওই অস্থায়ী বইয়ের স্টলটিতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করার অভিযোগ ওঠে কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বিরুদ্ধে। মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের ওপর এই আঘাতের প্রতিবাদে সরাসরি রাস্তায় নামেন শহরের বিশিষ্ট চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ তথা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চিকিৎসক ড. অশোক কুমার ভকত। পর পর দু’দিন সন্ধ্যায় বহরমপুরের একাধিক স্টল থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকার বই কিনে তিনি পথচলতি সাধারণ মানুষ, ছাত্রছাত্রী ও বইপ্রেমীদের হাতে বিনামূল্যে বিলিয়ে দেন।

দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে শহরে চিকিৎসা পেশায় যুক্ত ড. ভকত স্পষ্ট জানান, তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সমর্থক নন; একজন সচেতন ও অরাজনৈতিক নাগরিক হিসেবেই তাঁর এই পদক্ষেপ। চিকিৎসকের কথায়, “আমি পেশায় চোখের ডাক্তার। সারাদিন চেম্বারে রোগী দেখে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটে। তবে সাম্প্রতিককালে রাজ্যজুড়ে যে অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। আমি রোগীদের চোখ ঠিক করি, কিন্তু এখন সময় এসেছে মানুষের চেতনার চোখ খুলে দেওয়ার। বইয়ের স্টল ভাঙবে কেন? বই পড়া মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। আজ এখানে স্টল ভাঙছে, কাল কি তবে কলেজ স্ট্রিটের আড়াই হাজার বইয়ের দোকানেও হামলা হবে? জেলায় জেলায় লাইব্রেরি আর স্টলগুলো কি এভাবেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে? আমাদের ছেলেমেয়েদের অন্তত লেখাপড়া শিখতে বাধা দিও না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “স্টল ভেঙে ভাবনার বিস্তার আটকানো যায় না। স্টল ভাঙলে মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে বই পড়বে, চেতনা জাগবে।”
এদিকে, উৎসবের আবহে বামপন্থীদের বইয়ের স্টল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী। বইয়ের স্টল ভাঙতে পেশিশক্তি ও বুলডোজারের ব্যবহারকে ‘চরম অন্যায়’ এবং ‘স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার হরণ’ বলে কটাক্ষ করেন তিনি।
প্রশাসনিক তৎপরতার অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই কংগ্রেস নেতা বলেন, “বামেদের বুকস্টল ভাঙার জন্য যে আস্ফালন আর বুলডোজারের দাপাদাপি দেখা যাচ্ছে—প্রশাসন যদি এই তৎপরতার সিকিভাগও উৎসবের দিনগুলিতে দেখাত, তবে পরিস্থিতি অন্যরকম হতো। চা-বাগান অঞ্চল কিংবা বিভিন্ন পুজো মণ্ডপ সংলগ্ন ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট মেরামত আর পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করলে অন্তত এবারের দুর্গাপুজোয় কলকাতাকে এমন রক্তস্নাত ও মৃত্যুময় হতে হতো না।”
রাজ্যে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার পরিবেশ নিয়ে সুর চড়িয়ে তিনি আরও বলেন, “প্রথমে গরিব মানুষ ও হকারদের উচ্ছেদ করা হলো, আর এখন সরাসরি বইয়ের দোকানে চালানো হচ্ছে বুলডোজার। এই তথাকথিত ‘বুলডোজার রাজ’ অবিলম্বে বাংলায় বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এটা কখনওই পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি হতে পারে না। বাংলা বরাবরের জন্য বহু মত ও সাহিত্যচর্চাকে সমাদর করে এসেছে। যে বইগুলো ভাঙা হচ্ছে, সেখানে কি রাষ্ট্রবিরোধী বা সন্ত্রাসবাদের কিছু রয়েছে? বই ভাঙতে বুলডোজার নামিয়ে এই বাহাদুরি দেখানোর মানে কী?”
গোরাবাজারের রাজপথে একজন চিকিৎসকের এই সৃজনশীল প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক মহলের তীব্র প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে বইয়ের স্টলে হামলার ঘটনাটি এখন শহর ছাড়িয়ে রাজ্যজুড়ে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার এক প্রতীকী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।