‘দলের বোঝাকে ছেঁটে ফেলুন’, তৃণমূল নেত্রীকে সরাসরি বার্তা অধীরের
‘রাহুল গান্ধী ও জাতীয় কংগ্রেস ছাড়া বিজেপিকে হটানো অসম্ভব, বাস্তব বুঝেছেন মমতা’
‘প্রয়োজনে বাংলায় দলের ব্যাটন নিন, ওঁর অধীনেই কাজ করব’; উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের ডাক
নিজস্ব সংবাদদাতা, বহরমপুর: দিল্লির ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) মঞ্চে তৃণমূলের অবস্থান এবং বাংলায় পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এক বেনজির রাজনৈতিক পরামর্শ দিলেন শীর্ষ কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী। তাঁর স্পষ্ট দাবি— পৃথক দল রেখে বিভ্রান্তি তৈরি না করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমস্ত সাংসদ-বিধায়ক নিয়ে সরাসরি জাতীয় কংগ্রেসে শামিল হয়ে যান। শুধু তাই নয়, মমতা যদি বাংলায় কংগ্রেসের ব্যাটন হাতে তুলে নেন, তবে রাজ্য কংগ্রেস তাঁর নেতৃত্ব মেনেই কাজ করতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা করেন তিনি।
অতীতের অবদান ও ১৫ বছরের ‘অত্যাচার’
কংগ্রেসের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অধীরবাবু বলেন:
* উত্থানের নেপথ্যে কংগ্রেস: রাজীব গান্ধীর আমলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যুব কংগ্রেসের সভাপতি হন এবং সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েটকে হারিয়ে লোকসভায় পৌঁছে ‘জায়ান্ট কিলার’ তকমা পান।
* ২০০১ ও ২০১১-র জোট: ২০০১ সালের বিধানসভা ও পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস তাঁকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়। অধীরবাবুর দাবি, ২০১১ সালে সোনিয়া গান্ধী তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেই বাংলায় তৃণমূল নেত্রীকে পূর্ণ সমর্থন দেন এবং তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী হতে সাহায্য করেন।
* নিচুতলার যন্ত্রণা: “তারপর টানা ১৫ বছর তৃণমূলের হাতে বাংলার কংগ্রেস কর্মীরা লাঞ্ছিত ও অত্যাচারিত হয়েছে,” মন্তব্য অধীরবাবুর। ফলে দিল্লির মঞ্চে হঠাৎ ঘনিষ্ঠতা নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে গভীর বিভ্রান্তি ও অস্বস্তি তৈরি করছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
‘রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কংগ্রেসের শরণে’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিল্লি সফরের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে কংগ্রেসের এই বর্ষীয়ান নেতা বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজন বাস্তববাদী নেত্রী। ভোটে ধাক্কা খাওয়ার পর তিনি বুঝে গেছেন যে জাতীয় কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীকে ছাড়া বিজেপিকে হারানো কিংবা নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আজ উনি বুঝতে পেরেছেন রাহুল গান্ধীই পারেন বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে, তাই তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্ব নিয়েও তৃণমূলের আর আপত্তি নেই।”
‘দলের ব্যাগেজ ও খোকাবাবুকে ছাঁটুন’
সংবাদমাধ্যমের সামনে কোনো রাখঢাক না রেখেই তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশকে নিশানা করেন অধীর চৌধুরী। তিনি বলেন:
“দিল্লি হাইকমান্ড এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়— উভয়কেই আমি বলব, এই জটিলতা না রেখে মমতা সোজা কংগ্রেসে যোগ দিন। দলের বোঝা কে, দলের ‘ব্যাগেজ’ কে, দলের ‘খোকাবাবু’ কে— তা মমতাদেবী ভালো করেই চেনেন। এই সব উৎপাত ও ঝঞ্ঝাট হটিয়ে উনি সটান কংগ্রেসে আসুন। দরকার হলে বাংলায় কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিন উনি, আমরা ওঁর অধীনেই রাজনীতি করব।”
উপনির্বাচন থেকেই শুরু হোক পথচলা: অধীর
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সদিচ্ছা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে অধীর চৌধুরী বলেন, “লক, স্টক অ্যান্ড ব্যারেল— লোটা-কম্বল নিয়ে তৃণমূলের সমস্ত বিধায়ক ও সাংসদ কংগ্রেসে শামিল হোন। এই জোটের সদিচ্ছা আসন্ন উপনির্বাচন থেকেই স্পষ্ট করা হোক। মুর্শিদাবাদের উপনির্বাচনে আমাদের প্রার্থী আব্দুল্লাহ কাফি। সেখানে তৃণমূল প্রার্থীর জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই নন্দীগ্রামের ধাঁচে মমতাদেবী যদি প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে কংগ্রেস প্রার্থী আব্দুল্লাহ কাফিকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান, তবে সেটাই হবে একসঙ্গে পথচলার আসল রাজনৈতিক বার্তা।”
সোনিয়া ও রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক উদারতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে অধীরবাবু যোগ করেন, কংগ্রেস কোনো ক্ষুদ্র পরিসর নয়, কংগ্রেস একটি সুবিশাল বটবৃক্ষ। রাজনৈতিক অস্তিত্বের স্বার্থে সেই আশ্রয়ে যখন আসতেই হচ্ছে, তখন মধ্যবর্তী সমস্ত দ্বন্দ্ব মিটিয়ে এক ছাতার তলাতেই তৃণমূল নেত্রীর প্রত্যাবর্তন ঘটানো উচিত।