বদলের বাংলায় প্রথম ক্যাবিনেট, কী ঘোষণা করবেন শুভেন্দু?

নিউজ ফ্রন্টঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে সোমবার। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবার রাজ্য সচিবালয় ‘নবান্ন’-এ পা রাখতে চলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। দুপুর ১২টায় নবান্ন সভাঘরে শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বৈঠকে বসবেন তিনি। একইসঙ্গে পরিবর্তনের সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার জবাব এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের রূপরেখা এই প্রথম ক্যাবিনেট থেকেই স্পষ্ট হতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

মুখ্যমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই নবান্ন চত্বরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে কলকাতা ও হাওড়া পুলিশ। রবিবার কলকাতা পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ এবং হাওড়া সিটি পুলিশ কমিশনার অখিলেশ চতুর্বেদী নবান্ন চত্বর ঘুরে দেখেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখে আধিকারিকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকও করেন তাঁরা। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, সোমবার মুখ্যমন্ত্রী টানা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেবেন। প্রথমে রাজ্যের শীর্ষ আমলাদের সঙ্গে প্রশাসনিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করবেন। এরপর জেলাশাসকদের সঙ্গে জেলার পরিস্থিতি ও উন্নয়নমূলক কাজের পর্যালোচনা করবেন। সন্ধ্যায় রাজ্যের পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেন ডিজিপি সিদ্ধ নাথ গুপ্ত, কলকাতা পুলিশ কমিশনার-সহ বিভিন্ন জোনের শীর্ষ পুলিশ কর্তারা।

অন্যদিকে শনিবার ব্রিগেডে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে আরও পাঁচজন মন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। সোমবার লোক ভবনে রাজ্যপাল আর.এন. রবির উপস্থিতিতে মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ ও দফতর বণ্টনের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হতে পারে বলে সূত্রের খবর। তবে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পরিবর্তনের সরকারের প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠক।

সরকারি সূত্রে ইঙ্গিত, প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠক থেকেই একাধিক বড় সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিতে পারে বিজেপি সরকার। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পকে রাজ্যে সার্বজনীনভাবে চালুর সিদ্ধান্ত। এতদিন স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের কথা তুলে কেন্দ্রীয় এই প্রকল্পকে কার্যকর করেনি তৃণমূল সরকার। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার নবান্ন থেকেই আয়ুষ্মান ভারতের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এবার সেই নবান্ন থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘ড্রিম প্রজেক্ট’ বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে চাইছে নতুন সরকার।

এছাড়াও রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি সপ্তম পে কমিশন বাস্তবায়ন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হতে পারে। এবারের নির্বাচনে ‘মোদি গ্যারান্টি’র অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল বকেয়া ডিএ এবং পে কমিশন সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান। ফলে ক্ষমতায় এসেই সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে হাঁটতে চান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারি কর্মচারীদের একাংশের মতে, নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেও এই ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তৃণমূলের জনপ্রিয় ‘লক্ষীর ভাণ্ডার’-এর পাল্টা হিসেবে বিজেপির ঘোষিত ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্প নিয়েও প্রথম ক্যাবিনেটেই সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জল্পনা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই প্রকল্পে মাসিক ৩ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠক থেকেই জনমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের বার্তা দিতে চাইছে নতুন সরকার।

রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছে, ২০১১ সালের ২১ মে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সিঙ্গুরে ৪০০ একর জমি ফেরতের সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেওয়া হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক নজিরের আবহেই এবার ‘মোদি গ্যারান্টি’কে বাস্তব রূপ দিতে চাইছে শুভেন্দু সরকারের প্রথম ক্যাবিনেট।

তবে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি। সরকারি সূত্রেই স্বীকার করা হচ্ছে, একের পর এক জনমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, “সংকল্প পূরণই মূল লক্ষ্য, কিন্তু অর্থের জোগান একটা বড় চ্যালেঞ্জ।”

উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০১১ সালে প্রায় ২ লক্ষ ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল সরকার। গত ১৫ বছরে সেই ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে প্রশাসনিক মহলের দাবি। সেই বিপুল ঋণের ভার মাথায় নিয়েই এখন পরিবর্তনের সরকারের সামনে জনতার প্রত্যাশা পূরণের কঠিন পরীক্ষা। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই পরীক্ষায় কতটা সফল হন, সেদিকেই নজর এখন রাজ্যের সাধারণ মানুষ থেকে সরকারি কর্মচারী, রাজনৈতিক মহল সকলের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *