বঞ্চনার অবসান নাকি আশার দোলাচল? আজ দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘চাতক দৃষ্টি’ রাজ্যের লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মীর

বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা | ১৮ মে, ২০২৬

রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আজ, সোমবার বসছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক। মাত্র এক সপ্তাহ আগে, গত ৯ মে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বৈঠকেই ছয়টি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এই ‘পরিবর্তনের সরকার’। সেদিনই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে, ১৮ মে-র পরবর্তী বৈঠকে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা (DA), পে কমিশন এবং আরজি কর কাণ্ডের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। আর সেই কারণেই আজ নবান্ন থেকে শুরু করে মহাকরণ বা রাজ্যের প্রতিটি সরকারি দপ্তরের কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের চোখ আটকে রয়েছে এই বৈঠকের দিকে।

আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই কড়া অবস্থান নিয়েছে নতুন সরকার। প্রাক্তন পুলিশ কমিশনারসহ ৩ জন শীর্ষ আইপিএস আধিকারিককে ইতিমধ্যেই সাসপেন্ড করে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত (Disciplinary Action) শুরু করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, অপরাধ ধামাচাপা দিতে নির্যাতিতার পরিবারকে টাকা দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছিল, তা সম্পূর্ণ সত্য। পুলিশ ও প্রশাসনের নজিরবিহীন ‘রাজনীতিকরণ’ নিয়ে সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আজকের বৈঠকে এই মামলার অগ্রগতি এবং স্বাস্থ্য ও পুলিশ প্রশাসনের শুদ্ধিকরণ নিয়ে নতুন কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কি না, সেদিকে নজর থাকবে আমজনতার।

নির্বাচনী ইস্তাহারে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ এবং কেন্দ্রীয় হারে সপ্তম পে কমিশন কার্যকর করা হবে। তবে কর্মচারী ফেডারেশন ও ট্রেড ইউনিয়নগুলো এখনও পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না। তাদের বক্তব্য, সরকার এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো কর্মচারী সংগঠনের সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসেনি।

বর্তমানে রাজ্য সরকারি কর্মীদের ৪২ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (DA) বকেয়া রয়েছে। কর্মীদের মনে মূল সংশয় দুটি বিষয় নিয়ে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায় অনুযায়ী, ২০০৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘অল ইন্ডিয়া কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স’ (AICPI) মেনে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের ডিএ দেওয়া হবে কি না? বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ‘রোপা ২০০৯’-এ ডিএ-কে কর্মচারীদের আইনি অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত। কিন্তু তৃণমূল সরকারের জামানায় ‘রোপা ২০১৯’-এ সেই অধিকারের সংস্থানটি বাদ দেওয়া হয়।

কনফিডারেশন অফ স্টেট গভর্মেন্ট এমপ্লয়িজ সভাপতি শ্যামল কুমার মিত্র বলেন “রোপা ২০১৯-এ রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য মহার্ঘভাতার কোনো স্পষ্ট সংস্থান রাখা হয়নি। নতুন সরকার এই আইনি ত্রুটি সংশোধন করে ডিএ-কে পুনরায় অধিকারের তালিকায় ফেরায় কি না, সমস্ত কর্মচারীরা সেদিকেই তাকিয়ে আছেন।”

শুধুমাত্র স্থায়ী সরকারি কর্মচারীরাই নন, এই বৈঠকের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছেন রাজ্যের কয়েক লক্ষ অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মী। পার্শ্বশিক্ষক (Para Teacher), মিড-ডে মিল কর্মী, আশা (ASHA) কর্মী এবং পঞ্চায়েত ট্যাক্স কালেক্টরদের মতো কর্মীরা বছরের পর বছর ধরে দৈনন্দিন সরকারি কাজের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে আসছেন। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ— সমকাজে সমবেতন তো দূরস্ত, ন্যূনতম মজুরিটুকুও তাঁরা পান না। এই বিশাল অংশের চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থায়ীকরণের বিষয়ে আজ কোনো মানবিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, তা দেখার।

নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাজ্যের ভেঙে পড়া আর্থিক পরিকাঠামো। পূর্বতন সরকারের কাছ থেকে প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকার বিপুল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মসনদে বসেছেন শুভেন্দু অধিকারী। এই পর্বতপ্রমাণ দেনা সামলে একদিকে উন্নয়ন বজায় রাখা, আর অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মচারীর বহুদিনের বঞ্চনা দূর করে মোদির নির্বাচনী ‘গ্যারান্টি’ পূরণ করা— নতুন সরকারের কাছে এক চরম অ্যাসিড টেস্ট হতে চলেছে। আজ দুপুরের পর নবান্ন থেকে কী বার্তা আসে, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *