নবান্নের নজিরবিহীন ফতোয়া! সরকারি কর্মীদের সংবাদমাধ্যমে মুখ খোলায় কড়া নিষেধাজ্ঞা

‘গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ’-এর অভিযোগে সরব তৃণমূল

বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা | ২১ মে, ২০২৬

রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের সংবাদমাধ্যমের কাছে বক্তব্য রাখা, ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ এবং সরকারি তথ্য বা গোপন নথি ফাঁসের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়া নির্দেশিকা জারি করল নবান্ন। মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়ালের স্বাক্ষর করা এই নতুন সার্কুলার ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক শোরগোল পড়ে গেছে। ‘অল ইন্ডিয়া সার্ভিস’ (IAS, IPS), ‘রাজ্য সিভিল সার্ভিস’ (WBCS) সহ সমস্ত স্তরের সরকারি কর্মীদের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে। আর এই নির্দেশিকাকে ‘গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ’ আখ্যা দিয়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সুর চড়িয়েছে বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস।

একনজরে নবান্নের ১০ দফা কড়া নির্দেশিকা:

মুখ্যসচিবের জারি করা এই নির্দেশিকা রাজ্যের সমস্ত দফতর, কমিশনার, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে পাঠিয়ে কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকার মূল পয়েন্টগুলি নিচে দেওয়া হলো:

  • ১. আচরণবিধি কঠোরভাবে পালন: মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘Conduct Rules’ বা কর্মচারী আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
  • ২. মিডিয়া অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা: সরকারের পূর্ব অনুমতি বা ছাড়পত্র ছাড়া কোনও টেলিভিশন, রেডিও বা অন্য কোনও মিডিয়া প্রোগ্রামে অংশ নেওয়া যাবে না।
  • ৩. বেসরকারি অনুষ্ঠানেও কড়াকড়ি: বেসরকারি বা স্পনসরড (Sponsored) কোনও অনুষ্ঠানে যোগদানের আগেও সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক।
  • ৪. তথ্য ও নথি প্রকাশ নিষিদ্ধ: সরকারি তথ্য, গোপন নথি বা কোনও প্রশাসনিক কাগজপত্র সংবাদমাধ্যমে কিংবা বাইরের কোনও ব্যক্তির কাছে সরবরাহ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • ৫. লেখালিখিতে অনুমতি: সরকারের আগাম অনুমতি ছাড়া সংবাদপত্র, সাময়িকী, ম্যাগাজিন বা অন্য কোনও মাধ্যমে কোনও রকম লেখা প্রকাশ করা যাবে না।
  • ৬. পত্রিকা সম্পাদনা: কোনও সংবাদপত্রের সম্পাদনা বা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হবে।
  • ৭. সম্প্রচার মাধ্যমে বক্তব্য: রেডিও, টিভি বা অন্য কোনও সম্প্রচার মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
  • ৮. নীতি নিয়ে মন্তব্য নয়: কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের কোনও নীতি বা সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনও নেতিবাচক মন্তব্য করা যাবে না।
  • ৯. সোশ্যাল মিডিয়ায় সতর্কতা: ফেসবুক, এক্স (টুইটার) বা অন্য কোনও সামাজিক মাধ্যমে সরকারি বিষয় সংক্রান্ত মতামত বা তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।
  • ১০. বিভাগীয় পদক্ষেপ: এই নির্দেশিকার কোনও একটি ধারা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ!” কর্মচারী সংগঠনের পাশে দাঁড়িয়ে তোপ কুণাল ঘোষের

সরকারের এই বিতর্কিত ফতোয়ার বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবারই জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের তরফে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন “নতুন সরকার যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, তা আসলে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ। সরকার বলতে চাইছে কর্মীরা সরকারি নীতির কোনও বিরোধিতা করতে পারবেন না। আমরা এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে কর্মচারী সংগঠনগুলোর পাশে আছি। এখন তো সরকারি কর্মচারীরা তাঁদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (DA) নিয়েও কোনও কথা বলতে পারবেন না।”

কুণাল ঘোষ আরও মনে করিয়ে দেন যে, তৃণমূল জমানায় ডিএ নিয়ে তৎকালীন সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীকে যেভাবে প্রতিদিন আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল, নতুন সরকার ক্ষমতা এসেই সেই সমালোচনা বন্ধ করতে চাইছে। তাঁর আশঙ্কা, এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আসার আড়ালে ভবিষ্যতে আরও বড় কোনও ‘কর্মচারী-বিরোধী’ সিদ্ধান্ত নিতে পারে এই নতুন সরকার।

দিল্লির রিমোট কন্ট্রোল শাসন’: এক্স হ্যান্ডেলে গর্জে উঠলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক

এই নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়া ‘X’ (সাবেক টুইটার)-এ তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তিনি এই সার্কুলারটিকে স্বৈরাচারী মানসিকতার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে লিখেছেন “এই সার্কুলারে ‘সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা’ শব্দবন্ধটি একটি সতর্কবার্তার মতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এটি সুশাসন রক্ষার জন্য নয়, বরং বাংলার সরকারি কর্মচারীদের ওপর জোরপূর্বক নীরবতা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য করা হয়েছে। প্রেসের সাথে কথা বলা যাবে না, নিবন্ধ লেখা যাবে না, মিডিয়া প্রোগ্রামে অংশ নেওয়া যাবে না, এমনকি কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের সমালোচনাও করা যাবে না! বিজেপির এই রিমোট-কন্ট্রোল শাসনে ‘নীরবতা’ই এখন প্রশাসনিক প্রধান যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, এই মারাত্মক সার্কুলারটি শৃঙ্খলার জন্য নয়, বরং দিল্লির প্রভুদের প্রতি পরম আনুগত্য নিশ্চিত করতে মৌলিক অধিকার এবং মুক্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে পদ্ধতিগতভাবে শ্বাসরোধ করার জন্য আনা হয়েছে। তাঁর কথায়— ওঁদের বার্তা পরিষ্কার—যেমনটা বলা হবে তেমনটাই ভাবো, অনুমতি পেলেই কেবল মুখ খোলো। যখন একটি সরকার সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, তখন সে ভিন্নমতকে পিষে দিতে শুরু করে। এটা শক্তি নয়, এটা গণতন্ত্রের গলা টিপে হত্যা করা!”

নবান্নের এই নতুন নির্দেশিকা এবং তা নিয়ে বিরোধীদের এই তীব্র আক্রমণের পর, আগামী দিনে নবান্ন বনাম রাজ্য সরকারি কর্মীদের সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *