কলকাতা: রাজ্যে পালাবদলের পরেই আরজি কর ফাইল আবার খুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আর তাঁর পরেই কর্তব্যরত অবস্থায় গাফিলতি এবং তদন্ত ‘মিসহ্যান্ডেল’ করার অভিযোগে তিন দাপুটে আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, তিন পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত (Disciplinary Action) শুরু হয়েছে। তাঁরা হলেন বিনীত গোয়েল তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনার (বর্তমানে এডিজি আইবি)। অভিষেক গুপ্তা তৎকালীন ডিসি নর্থ এবং ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় তৎকালীন ডিসি সেন্ট্রাল।মুখ্যমন্ত্রী জানান, নির্যাতিতার পরিবারের করা অভিযোগের ভিত্তিতে রাজ্যের মুখ্যসচিব ও স্বরাষ্ট্রসচিব একটি প্রাথমিক তদন্ত বা কারণ অনুসন্ধান করেন। সেই রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। দেখা গেছে, ঘটনার পর দুই উচ্চপদস্থ পুলিশকর্তা নির্যাতিতার পরিবারকে টাকা অফার করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী এই কাজকে ‘অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। মূলত তদন্তে চরম গাফিলতি ও পরিবারের প্রতি অসংবেদনশীল আচরণের কারণেই এই কঠোর পদক্ষেপ।
তৎকালীন ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, “নিজের এক্তিয়ার ছেড়ে ডিসি নর্থের এলাকায় গিয়ে তিনি কার নির্দেশে একের পর এক প্রেস কনফারেন্স করেছেন? কেন তিনি তদন্তের মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করছিলেন?” এই বিষয়টিও এখন উচ্চপর্যায়ের তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
পাশাপাশি আরজি কর মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ছাত্রীর ধর্ষণ ও খুনের মামলার শুনানিতে বড় পরিবর্তন এল কলকাতা হাইকোর্টে। এখন থেকে এই হাই-প্রোফাইল মামলার শুনানি হবে বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের ডিভিশন বেঞ্চে। আজ, ১৭ মে এই সংক্রান্ত নতুন নির্দেশিকা সামনে এসেছে।
কেন বদলাল ডিভিশন বেঞ্চ?
এর আগে এই মামলার শুনানির দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা এবং বিচারপতি রাই চট্টোপাধ্যায়। তবে গত ১১ মে ওই ডিভিশন বেঞ্চ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে এই মামলা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন (Recusal)। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রধান বিচারপতির নির্দেশে নতুন এই বেঞ্চ গঠন করা হলো।
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে শিয়ালদহ আদালত এই মামলার একমাত্র ধৃত সঞ্জয় রায়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা শুনিয়েছিল। তবে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI) সঞ্জয় রায়ের ফাঁসির দাবি জানিয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। অন্যদিকে, নিজেকে নির্দোষ দাবি করে জেল থেকে মুক্তির আর্জি জানিয়েছে সঞ্জয়ও। নতুন বেঞ্চে এই দুই বিপরীতমুখী আবেদনের ওপর শুনানি হবে।
কেবল উচ্চ আদালত নয়, বিচারের দাবিতে নিম্ন আদালতেও লড়াই জারি রেখেছেন নির্যাতিতার মা-বাবা। তাঁরা কলকাতার শিয়ালদহ আদালতে একটি নতুন পিটিশন দাখিল করেছেন। তাঁদের অভিযোগের তির তিন প্রভাবশালী ব্যক্তির দিকে নির্মল ঘোষ: তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন বিধায়ক। সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় এবং তৎকালীন ঘোলা থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক (OC)।
নির্যাতিতার পরিবারের দাবি, এই তিন ব্যক্তি ঘটনার দিন প্রভাব খাটিয়ে দেহের দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তে বাধা দিয়েছিলেন। এমনকি কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা নিয়মকানুন না মেনেই অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে দেহ সৎকার করতে বাধ্য করেছিলেন। প্রমাণের স্বার্থে এঁদের দ্রুত গ্রেপ্তারের আবেদন জানিয়েছেন অভয়ার বাবা-মা।
আরজি কর কাণ্ড নিয়ে শুরু থেকেই রাজ্য রাজনীতি সরগরম। চিকিৎসক সমাজ, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের একাংশের দাবি, এই মামলায় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নতুন বেঞ্চ গঠনের পর এবার মামলার পরবর্তী শুনানির দিকে নজর গোটা রাজ্যের।