নিজস্ব সংবাদদাতা, বড়ঞা: লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে বুধবার ঝোড়ো সফর করলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বীরভূমের নানুর এবং মুর্শিদাবাদের বড়ঞায় জনসভা থেকে তিনি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের আবেগ ছুঁয়ে গেলেন, অন্যদিকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে বিঁধলেন তীব্র আক্রমণ আর শ্লেষ মিশিয়ে। বড়ঞার ডাকবাংলা কিষান মান্ডি মাঠের সভা থেকে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিলেন, “প্রার্থী কে ভুলে যান, জোড়াফুল চিহ্ন মনে রাখুন। এই সরকার থাকলে তবেই আপনার লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী আর কৃষক বন্ধু প্রকল্প চলবে।”
বড়ঞার সভা শুরু করতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টেনে আনেন বাংলার মণীষীদের কথা। তিনি বলেন, “ঋত্বিক ঘটক মারা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী আমাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যা আজও আমি সযত্নে রেখে দিয়েছি। মহাশ্বেতা দেবী আমার মায়ের মতো ছিলেন, তিনি আমার রক্তে মিশে আছেন।” এরপরই মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত ‘ছানাবড়া’র প্রশংসা করে তিনি বলেন, “মুর্শিদাবাদের ছানাবড়া এই বড় বড়! একটা খেলে আর ভাত খেতে হয় না।”
এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেন কেন তিনি ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর মতো প্রকল্প চালু করেছিলেন। এর উৎস হিসেবে তিনি ২০১৬ সালের নোটবন্দিকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, “নোটবন্দির সময় মা-বোনেদের জমানো পুঁজি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় একদিন অভিষেকের মা (বৌদি লতা বন্দ্যোপাধ্যায়) আমার কাছে ছুটে এসে ৫০০ টাকা চেয়েছিলেন বাজার করার জন্য। তাঁর সব টাকা অকেজো হয়ে গিয়েছিল। তখনই আমি ঠিক করেছিলাম, মা-বোনেদের হাতে মাসিক টাকা পৌঁছে দিতে হবে যাতে দুঃসময়ে কারও কাছে হাত পাততে না হয়।” মমতা আরও জানান, তাঁর নিজেরও একটি মাটির ভাঁড় আছে যেখানে তিনি ৫-১০ টাকা করে জমান।
ভাগীরথীর ভাঙন রোধে কেন্দ্রের অসহযোগিতা নিয়ে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, রাজ্য সরকার নিজের উদ্যোগে ড্রেজিং ও সংস্কারের কাজ করবে। ১০০ দিনের কাজ নিয়ে কেন্দ্রের টাকা বন্ধের প্রতিবাদে তিনি বলেন, “কেন্দ্র টাকা দিচ্ছে না, তাই আমরা মহাত্মা গান্ধীর নামে নিজস্ব প্রকল্প শুরু করেছি। আগামী দিনে রাজ্যে কোনও কাঁচা বাড়ি থাকবে না, সব পাকা বাড়ি হবে এবং ঘরে ঘরে পরিস্রুত পানীয় জল পৌঁছাবে।”
আলুচাষিদের উদ্বেগের কথা মাথায় রেখে মমতা ঘোষণা করেন, “মিড ডে মিলের জন্য সরকার সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে আলু কিনে নেবে। আপনাদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে সরকার পাশে থাকবে। রেশনে এখন আর আধভাঙা চাল নয়, বরং চাষিদের কাছ থেকে কেনা উন্নত মানের চাল দেওয়া হচ্ছে।”
ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়া (SIR) নিয়ে মুর্শিদাবাদের মায়েদের সতর্ক করেন মমতা। তিনি বলেন, “আমার পরিবারেরও কয়েকজনের নাম বাদ গিয়েছিল। এখন তা তোলা হয়েছে। ওরা ভাবছে এভাবেই সরকার নিয়ে নেবে? এত সহজ নয়। বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী।” অনুপ্রবেশ ইস্যুতে বিজেপিকে ‘ছুপারুস্তম’ বলে কটাক্ষ করে তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি নিজের স্বার্থে লোক ঢোকায়।
কলকাতায় আইটিবিপির ডিজি-র কথিত সফরের কথা উল্লেখ করে মমতা অভিযোগ করেন যে মেয়েদের তল্লাশির নামে অসম্মান করার চেষ্টা হতে পারে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “বাংলার মেয়েরা অন্যরকম। গায়ে হাত দিয়ে অসম্মান করলে তারা মুখ বুজে থাকবে না, প্রতিবাদ করবে।”
সভার শেষে মমতা ভোটারদের সতর্ক করে বলেন, “ভোটের আগে ওরা ক্যাশ দেবে, আর ভোটের পর গ্যাস দেবে। কিছু মানুষ সাম্প্রদায়িক কথা বলে ভোট কাটতে আসবে, তারা বিজেপিরই দালাল। একটা ভোটও ভাগ হতে দেবেন না। জোড়াফুল জিতলে তবেই আপনাদের উন্নয়ন বজায় থাকবে।”