নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশের পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ও পুলিশি কাঠামোয় নজিরবিহীন এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবার বড় কোপ পড়ল সরাসরি ভোট পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং অফিসারদের (RO) ওপর। সোমবার এক নির্দেশিকা জারি করে রাজ্যের ৭৩ জন রিটার্নিং অফিসারকে একযোগে বদলি করে দিল কমিশন।
রাজ্যের মোট ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিটিতে একজন করে রিটার্নিং অফিসার থাকেন। তাঁদের মধ্য থেকেই ৭৩ জনকে সরিয়ে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই তালিকায় রয়েছে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী কেন্দ্র ভবানীপুর। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (CEO) পাঠানো প্রস্তাবের ভিত্তিতেই এই ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কমিশনের কড়া নির্দেশ অনুযায়ী, নবনিযুক্ত সকল রিটার্নিং অফিসারকে মঙ্গলবার, ২৪শে মার্চ বিকেল ৫টার মধ্যে তাঁদের নতুন কেন্দ্রে রিপোর্ট করতে হবে। এরপর বুধবার সকাল ১১টা থেকে তাঁদের বিশেষ প্রশিক্ষণ পর্ব শুরু হবে।
ভোট ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কমিশন যে রদবদল শুরু করেছিল, তার ধারা এখনও অব্যাহত। এই তালিকায় এর আগে যুক্ত হয়েছেন রাজ্যের মুখ্যসচিব ও স্বরাষ্ট্রসচিব। প্রাক্তন মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী ও স্বরাষ্ট্রসচিব জগদীশপ্রসাদ মিনাকে সরিয়ে যথাক্রমে দুষ্মন্ত নারিয়ালা এবং সঙ্ঘমিত্রা ঘোষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
কলকাতা পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকারের জায়গায় অজয়কুমার নন্দা এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি পীযূষ পাণ্ডের জায়গায় সিদ্ধিনাথ গুপ্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও পাঁচজন ডিআইজি-কেও (DIG) সরানো হয়েছে।
গত ১৮ই মার্চ কমিশন রাজ্যের ১১টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জেলার জেলাশাসক (DM) বদলে দিয়েছিল। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, দার্জিলিং এবং আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসকরা একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (DEO) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের সরিয়ে নতুন মুখ আনার মাধ্যমে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে চাইছে কমিশন। পাশাপাশি কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণের ডিইও-দেরও (DEO) পরিবর্তন করা হয়েছে।
প্রশাসনের ওপর নির্বাচন কমিশনের এই নজিরবিহীন কড়াকড়ির মধ্যেই সকল স্তরের আধিকারিকদের উদ্দেশ্যে কড়া নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। মুখ্যসচিবের দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের গাইডলাইন বা নির্দেশিকা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। ভোট যাতে সম্পূর্ণ অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়, তা নিশ্চিত করা প্রতিটি সরকারি কর্মীর প্রাথমিক দায়িত্ব।
কমিশন সূত্রে খবর, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনও রাজনৈতিক প্রভাব যাতে না পড়ে এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করতেই এই কৌশলগত বদলি করা হয়েছে। বিশেষ করে ভবানীপুরের মতো হাই-প্রোফাইল কেন্দ্রের রিটার্নিং অফিসার বদল করার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
এখন দেখার, এই বিশাল প্রশাসনিক রদবদলের পর ২০২৬-এর নির্বাচনী রণক্ষেত্রে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা কমিশনের পক্ষে কতটা সম্ভব হয়।