নিজস্ব প্রতিনিধি, বেলডাঙা: মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চলা নজিরবিহীন তাণ্ডবের ঘটনায় কড়া পদক্ষেপ নিল জেলা পুলিশ। শনিবার সন্ধ্যায় এক সাংবাদিক বৈঠক করে মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার সুপার (SP) কুমার সানি রাজ জানান, অশান্তি ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় এখনও পর্যন্ত মোট ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দুই দিনের এই ঘটনার ‘মূলচক্রী’ হিসাবে পুলিশ মতিউর রহমান কে চিহ্নিত করে আজকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে এই পদক্ষেপের পাশাপাশি সাংবাদিকদের ‘উস্কানিমূলক’ প্রশ্ন না করার পরামর্শ দিয়ে একপ্রকার উল্টো কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন পুলিশ সুপার।
পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ জানান, শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া তাণ্ডবের ঘটনায় পুলিশ সিসিটিভি এবং ভিডিও ফুটেজ দেখে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করছে। ধৃত ৩০ জনের মধ্যে ৪ জনকে নির্দিষ্টভাবে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “আমরা ভিডিও ফুটেজ দেখে মূলচক্রী মতিউর রহমানকে চিহ্নিত করেছি এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলা রুজু করেছে।” তবে ধৃতদের কোনও রাজনৈতিক পরিচয় এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান।
শুক্রবার পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু হলেও, শনিবারের অশান্তিকে ‘সম্পূর্ণ পরিকল্পিত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন পুলিশ সুপার। এদিন বেলডাঙার বড়ুয়া মোড় অবরোধ করে কয়েকশো মানুষ। এর ফলে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক এবং ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। বিক্ষোভকারীরা স্টেশনের সিগন্যাল পোস্ট উপড়ে ফেলা থেকে শুরু করে সরকারি বাসে হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বড়ুয়া মোড়ে লাঠিচার্জ করতে বাধ্য হয়। এসপি-র দাবি, “শুক্রবারের আবেগ হয়তো সঙ্গত ছিল, কিন্তু শনিবার যা হয়েছে তা স্রেফ অশান্তি পাকানোর ছক।”
বেলডাঙার অশান্তি কভার করতে গিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হন সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা। একটি টিভি চ্যানেলের মহিলা সাংবাদিক সোমা মাইতিকে এবং ওই চ্যানেলের চিত্র সাংবাদিক রঞ্জিত মাহাতোকে রাস্তায় ফেলে মারধর ও শ্লীলতাহানি করার অভিযোগ ওঠে উন্মত্ত জনতার বিরুদ্ধে। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েও সাংবাদিকদের উদ্দেশে বিতর্কিত পরামর্শ দেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন “আপনারা যখন এই সব জায়গায় যাবেন, একটু বুঝে প্রশ্ন করুন। ওদের অনেকেই দুষ্কৃতী। এমন কোনও কথা যা উস্কানি জোগাতে পারে, তা থেকে দূরে থাকুন। নিজেকে সুরক্ষিত রেখে কাজ করুন।”
পুলিশ সুপারের এই মন্তব্য ঘিরে সাংবাদিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার দায়ে কি পরোক্ষভাবে সাংবাদিকদের আচরণের দিকেই আঙুল তুললেন জেলা পুলিশ প্রধান?
মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা আলাউদ্দিন শেখকে ঝাড়খণ্ডে খুন করা হয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখতে জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল ইতিমধ্যেই ঝাড়খণ্ডে পৌঁছেছে। সেখানে তদন্ত প্রক্রিয়া জারি রয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর।
বর্তমানে বেলডাঙার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও চাপা উত্তেজনা বজায় রয়েছে। এলাকায় কড়া নজরদারি চালাচ্ছে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও র্যাফ।