দুর্গাপুর গণধর্ষণ কাণ্ডে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে তীব্র বিতর্ক, রাজনৈতিক মহলে উত্তাল রাজ্য

‘মেয়েদের বেশি রাতে বাইরে যাওয়া উচিত নয়!’- মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শে বিরোধীদের তোপ, অভিযোগ: ভিকটিম-ব্লেমিং ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা আড়াল

নিউজ ফ্রন্ট | কলকাতা, ১২ অক্টোবর ২০২৫:
দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়ুয়া ওড়িয়া এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় সারা রাজ্যজুড়ে ক্ষোভের জোয়ার।
এর মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যে নতুন করে বিতর্কের আগুন জ্বলে উঠেছে।
তিনি বলেন — “বাইরে থেকে যারা এখানে পড়তে আসে, তাদের অনুরোধ করব যেন তারা রাতে বাইরে না যায়।”

এই মন্তব্যকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে প্রবল প্রতিক্রিয়া। বিরোধীদের অভিযোগ — মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, এখন প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় এড়াতে ভুক্তভোগীদেরই দায়ী করছেন।

দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে কয়েকদিন আগে এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রীকে নৃশংসভাবে গণধর্ষণ করা হয়।
অভিযোগ, কলেজের ভেতরেই এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং ঘটনায় একাধিক শিক্ষার্থী ও বহিরাগত জড়িত।
প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ছাত্রীটি সেদিন রাতে এক সহপাঠীর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে হোস্টেল ফিরছিলেন, সেই সময়ই তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়। পুলিশ ইতিমধ্যেই চারজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে।

ঘটনার পর রবিবার মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন “যারা বাইরে থেকে এখানে পড়তে আসে, আমি তাঁদের বলব, দয়া করে রাতে বাইরে যেও না। নিজেরাও একটু সতর্ক থেকো। বাবা-মাকেও বলব, নিজেদের ছেলেমেয়ের খোঁজ রাখুন।” তাঁর এই বক্তব্যের পরই বিরোধীরা একযোগে ক্ষোভ উগরে দেন। সমালোচকরা বলছেন মুখ্যমন্ত্রী প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতে ভিকটিমকেই দোষারোপ করছেন, যা একেবারেই ‘অগ্রহণযোগ্য ও অসংবেদনশীল’।

🔹 বিজেপির তীব্র প্রতিক্রিয়া

 সমীক ভট্টাচার্য, বিজেপি রাজ্য সভাপতি:

“মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য অত্যন্ত অপমানজনক। রাজ্যের মহিলাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ সরকার এখন তাদেরই দোষারোপ করছে। এটি সরাসরি ‘ভিকটিম-ব্লেমিং’-এর উদাহরণ। প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় আড়াল করতে মুখ্যমন্ত্রী এইভাবে নারীদের ঘরে বন্দি থাকতে বলছেন, যা সভ্য সমাজে লজ্জাজনক।”

 ড. সুকান্ত মজুমদার, বিজেপি সাংসদ:

“মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বে। তবুও তিনি রাজ্যে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর এই মন্তব্য লজ্জাজনক ও নিন্দনীয়। আইনের শাসন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। তাই এখন তাঁর নৈতিক দায়িত্ব পদত্যাগ করা।”

অমিত মালব্য, বিজেপি আইটি সেল প্রধান:

“এটাই প্রথম নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতেও একাধিকবার ধর্ষণ মামলায় ভুক্তভোগীকেই প্রশ্ন করেছেন।
২০১২ সালের পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণ মামলায় তিনি বলেছিলেন ‘এই ঘটনা সাজানো’। আবার নাদিয়ার হানস্কালি ঘটনায় বলেছিলেন, ‘মেয়েটা প্রেমের সম্পর্কে ছিল কি না তা দেখা হোক’। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর এই ধারাবাহিক ভিকটিম-ব্লেমিং অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

🔹 বামফ্রন্টের প্রতিক্রিয়া

ড. সুজন চক্রবর্তী, সিপিএম নেতা:

“ছাত্রীরা রাতে বেরোবে কেন — মুখ্যমন্ত্রী এই কথা বলে কার্যত ঘোষণা করলেন যে, রাজ্যে মহিলারা নিরাপদ নন।
নিরাপদ কেবল দুষ্কৃতী আর ধর্ষকরা। প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতেই এমন মন্তব্য।”

🔹 কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া

শুভঙ্কর সরকার, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি: “মুখ্যমন্ত্রীর এই বয়ান অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এটি কোনও দায়িত্ববান প্রশাসকের বক্তব্য হতে পারে না। দুর্গাপুর বাংলার অংশ — বেসরকারি কলেজ হলেও তা রাজ্যের আইনের আওতায়। সেক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলার অবনতির দায়ও মুখ্যমন্ত্রীরই।” তিনি আরও বলেন “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্ট্রিট ফাইটার হিসেবে শুরু করেছিলেন, কিন্তু রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে থেকেও তিনি আজ স্টেটসম্যান হতে ব্যর্থ। এটি বাংলার জন্য দুঃখজনক।”

তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী নারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন, কোনওভাবেই ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করেননি।

তবে মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গে গিয়ে আবার বলেন “আমার স্টেটমেন্ট ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে”। তিনি সাংবাদিকদের বলেন এই সব রাজনীতি আমার সঙ্গে করার চেষ্টা করবেন না। আমি তো প্রেসের সঙ্গে মিট করে কেও কেও তো প্রশ্ন সেট করে দিয়ে দেয়।
তবে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, দুর্গাপুর মেডিকেল কলেজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণে বিশেষ টিম গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। আইনশৃঙ্খলা প্রশ্নে রাজ্য সরকারকে যে বিরোধীরা নতুন করে আক্রমণের সুযোগ পেয়েছে, তা এখন নিশ্চিত। দুর্গাপুর গণধর্ষণ কাণ্ড ইতিমধ্যেই জনমনে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। এখন মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে সেই ক্ষোভ আরও বাড়ছে।
রাজ্য রাজনীতির আকাশে প্রশ্ন উঠছে — “যখন প্রশাসন ব্যর্থ, তখন দোষ কার?”
“নারীদের সতর্ক থাকতে বলার বদলে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা কোথায়?”

বাংলার রাজনীতিতে নারী নিরাপত্তা ইস্যুতে এই মন্তব্য নিঃসন্দেহে এক নতুন অধ্যায় খুলে দিল একটি অধ্যায়, যা প্রশ্নে ভরা, উত্তরে নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *