নিউজ ফ্রন্ট, নয়াদিল্লি:
ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলল তৃণমূল কংগ্রেস। আজ নির্বাচন সদনের সামনে সাংবাদিক সম্মেলন করে সংসদীয় প্রতিনিধি দল অভিযোগ করে যে, প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে চলা বৈঠকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমার তাঁদের পাঁচটি মূল প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দেননি।
সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে লোকসভা ও রাজ্যসভার মোট ১০ জন সাংসদ (যাঁদের মধ্যে ছিলেন ডেরেক ও’ব্রায়েন, শতাব্দী রায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র, মমতা বালা ঠাকুর প্রমুখ) CEC এবং কমিশনের টিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনের শুরুতেই প্রতিনিধি দল একযোগে তীব্র আক্রমণ করে। সাংসদ ডেরেক ও‘ব্রায়েন জানান, তাঁরা প্রায় ৪০ জন মানুষের একটি তালিকা কমিশনের হাতে তুলে দিয়েছেন, যাঁরা SIR প্রক্রিয়ার অমানবিক চাপের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন।
ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেন, “বৈঠকের শুরুতেই আমরা জানিয়েছি জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনের হাতে রক্ত লেগে আছে। আমরা SIR-এর বিরোধী নই, কিন্তু নির্বাচন কমিশন যেভাবে কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই ময়দানে নেমেছে, তার তীব্র বিরোধিতা করছি। তালিকাটি দেখানোয় তিনি (CEC) বিস্মিত হন।”
সাংসদ শতাব্দী রায় যোগ করেন, বৈঠকের সময়ই তাঁরা খবর পান যে মুর্শিদাবাদের খড়গ্রামে আরও এক জন বিএলও (BLO) মারা গেছেন, ফলে মৃতের সংখ্যা ৪০-এ পৌঁছাল।
তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র ও শতাব্দী রায় উভয়েই ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন “নির্বাচন কমিশন বলছে, আগের ভোটার তালিকা নাকি বিশ্বাসযোগ্য নয়। যদি তাই হয়, তাহলে গোটা লোকসভাকেই বাতিল করা উচিত। ২০০২ সালের পর যে সমস্ত নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোরও বৈধতা প্রশ্নাতীত নয়।” যদি বর্তমান ভোটার তালিকা অবৈধ হয়, তবে সেই ভোটারদের দ্বারা নির্বাচিত মোদী সরকার সহ সকল জনপ্রতিনিধিরাও সমানভাবে অবৈধ।
তৃণমূলের স্পষ্ট প্রশ্ন, SIR প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য যদি ভুয়ো ভোটার এবং অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা হয়, তাহলে শুধু বাংলাকেই কেন টার্গেট করা হচ্ছে?
কেন ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং অরুণাচল প্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে, যেখানে একই ধরনের বা তার চেয়েও বেশি অনুপ্রবেশের সমস্যা রয়েছে, সেখানে এই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে না? অসমে কেন ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন‘-এর বদলে কেবল ‘স্পেশাল রিভিশন‘ করা হচ্ছে? তাঁরা অভিযোগ করেন, এর লক্ষ্য অনুপ্রবেশকারী বাদ দেওয়া নয়, বরং বাঙালিদের তাড়িয়ে দেওয়া বা তাঁদের নাগরিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা।
বিএলও-দের অমানবিক কাজের চাপ এবং প্রযুক্তির ব্যর্থতা নিয়ে সরব হন সাংসদরা। মহুয়া মৈত্র জানান, গ্রামীণ এলাকায় BLO-দের প্রতিদিন গড়ে ১২৫ থেকে ১৫০টি ফর্ম আপলোড করতে হচ্ছে। নেটওয়ার্ক ও সার্ভার সমস্যার কারণে তারা আপলোড করতে পারছেন না। “নির্বাচন কমিশন এই প্রযুক্তিগত ত্রুটিগুলির কোনও সমাধান করেনি, যার ফলে নির্বাচন কমিশনের হাতে BLO এবং সাধারণ নাগরিকদের রক্ত লেগে আছে।” তিনি বিস্মিত হন যে, এতগুলো মৃত্যুর খবর সত্ত্বেও কমিশনের কাছে কোনো তথ্য নেই।
তৃণমূল কংগ্রেস কমিশনকে বিজেপির প্রতি পক্ষপাতিত্বের প্রমাণস্বরূপ একাধিক ঘটনার উল্লেখ করে। তৃণমূলের ২৫ অক্টোবর থেকে পাঠানো একটিও চিঠির উত্তর কমিশন দেয়নি। অথচ বিজেপি যখন আবেদন করে, তখন নির্বাচন কমিশন খুশি মনে নিয়মে পরিবর্তন এনে অন্য বুথ থেকেও বিএলএ (BLA)-দের কাজ করার অনুমতি দিয়েছে। সাংসদ শতাব্দী রায় প্রশ্ন তোলেন, বাংলার এক বিজেপি নেতা প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই ১ কোটি ভোটার বাদ যাবে বলে ‘গ্যারান্টি’ দিচ্ছেন। “তিনি কি জাদুকর, নাকি জ্যোতিষী?” কমিশন তার বিরুদ্ধে কেন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি?
বিহারে জীবিকা দিদিরা সরকারি অনুদান বিতরণ করার পরও কমিশন কর্মী হিসেবে কাজ করতে পারলেও, বাংলায় কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে নিযুক্ত বিএসকে (BSK) কর্মীদের ব্যবহার করতে চাইছে না।
মহুয়া মৈত্র আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, নির্বাচন কমিশন দাবি করছে যে তারা নকল ভোটার ও অবৈধ নাগরিকদের বাদ দেবে। যদিও আইন অনুযায়ী মৃত এবং স্থানান্তরিতদের বাদ দেওয়ার জন্য ফর্ম ৭ ও ৮-এর ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, কোনো ব্যক্তি নাগরিক কিনা, তা নির্ধারণ করা নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়; সেই দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের। এই বিষয়ে কমিশনের উদ্যোগ রাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, পাঁচ প্রশ্নের কোনো জবাব না পাওয়ায় এই বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি এবং তাঁরা SIR প্রক্রিয়া নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।