জলমগ্ন কলকাতা ও মৃত্যুমিছিল: দায় কার?

মুখ্যমন্ত্রী-সিইএসসি-মেয়রের দোষারোপের খেলায় ক্ষোভে ফুঁসছে শহরবাসী, বিরোধীদের আক্রমণে রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থা

কলকাতা, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫: পুজোর ঠিক আগে টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন কলকাতা শহরের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একের পর এক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা রাজ্যের শাসক দলের প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে সামনে এনেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সিইএসসি এবং কলকাতা পৌরসভার মেয়রের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে এই মৃত্যুমিছিলের দায় কার, তা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা সরাসরি তৃণমূল সরকার এবং কলকাতা পৌরসভাকে কাঠগড়ায় তুলে ‘চূড়ান্ত অব্যবস্থা’র জন্য তীব্র সমালোচনা করেছে।

মুখ্যমন্ত্রীর দায় চাপানোর কৌশল: সিইএসসি-র অবহেলায় মৃত্যু

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিপর্যয়কে ‘আকস্মিক দুর্যোগ’ বলে দাবি করে সমস্ত দায় সিইএসসি-র উপর চাপিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ডিভিসি-র জল ছাড়া এবং ফারাক্কায় ড্রেজিং না হওয়ার কারণে রাজ্য এমনিতেই প্লাবিত ছিল, যার উপর এই প্রবল বৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে। তিনি নিহতদের পরিবারকে চাকরি এবং সিইএসসি-কে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি সরকারের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন বলে বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছে।

মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগের জবাবে সিইএসসি তাদের এক্স হ্যান্ডেলে (পূর্বে টুইটার) একটি পোস্টে স্পষ্ট করে জানায় যে, জননিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে তারা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর দায় এড়িয়ে দিয়ে লিখেছে, স্ট্রিট লাইট পোল এবং ট্র্যাফিক লাইট আমাদের দ্বারা পরিচালিত বা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না।”

অন্যদিকে, কলকাতা পৌরসভার মেয়রও অদ্ভুতভাবে নিজের দায় এড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নিহতরা অন্য কোনো কারণে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে থাকতে পারেন’ এবং তিনি দাবি করেন যে, পৌরসভার বাতিগুলো আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রমাণ করে যে, শাসক দল এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিতে রাজি নয় এবং একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে চলেছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই একের পর এক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারালেন অন্তত ৮ জন নিরীহ নাগরিক। আতঙ্ক ছড়িয়েছে গোটা শহরজুড়ে।

প্রশাসনিক ব্যর্থতার চিত্র: কেন এই মৃত্যুমিছিল?

এই মৃত্যুমিছিলের প্রকৃত কারণ শুধুমাত্র বৃষ্টি বা বিদ্যুৎ নয়, বরং তা কলকাতা পৌরসভা ও রাজ্য সরকারের চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনার ফল।

  • ভঙ্গুর নিকাশি ব্যবস্থা: সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের জল জমার মূল কারণ হলো শহরের নিকাশি ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা। শহরের খাল ও ড্রেনগুলো সংস্কারের বদলে ভরাট করা হয়েছে, যার ফলে জল সহজে নামতে পারছে না। বিরোধীদের অভিযোগ, ‘প্রোমোটারি রাজ’ এবং দুর্নীতির কারণে জলাভূমিগুলো বুজিয়ে ফেলা হয়েছে, যার ফলস্বরূপ এই বিপদ।
  • খোলা বিদ্যুৎ সংযোগ: যে তারগুলো শহরের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা, সেগুলোই এখন মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিইএসসি দায় ঝেড়ে ফেললেও, রাস্তার পাশে খোলা তার এবং বিদ্যুতের খুঁটিগুলো দেখভাল করার দায়িত্ব কার, সেই প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রশ্ন সরাসরি কলকাতা পৌরসভার দিকে।
  • দায় এড়ানোর রাজনীতি: যখন মানুষ মারা যাচ্ছে, তখন মুখ্যমন্ত্রী, মেয়র এবং সিইএসসি একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। এই ধরনের ‘গা বাঁচানোর রাজনীতি’ এই ট্র্যাজেডিকে আরও বেশি বেদনাদায়ক করে তুলেছে।

ক্ষুব্ধ মানুষ প্রশ্ন করছে, আমরা কি এই পরিণতির জন্য ট্যাক্স দিই?” বিরোধীরা দাবি করেছে, রাজ্য সরকার ও কলকাতা পৌরসভার উচিত এই ট্র্যাজেডির জন্য জবাবদিহি করা। তাদের মতে, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট একটি ‘ম্যানমেড দুর্যোগ’, যার বিচার জনগণ চায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *