‘উন্নয়নের ফাঁকা বুলি‘, ‘ম্যানমেড বন্যা‘ এবং ‘প্রোমোটারি রাজ‘-এর অভিযোগে সরব অধীর, শুভেন্দু ও সুজন
নিউজ ফ্রন্ট, কলকাতা, ২৩ সেপ্টেম্বর:
অবিরাম বৃষ্টিতে পুজোর আগমুহূর্তে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে কলকাতা শহর ও আশেপাশের জেলা। রাস্তাঘাট ডুবে গেছে কোমর সমান জলে, যান চলাচল প্রায় স্তব্ধ। শুধু তাই নয়, শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন। আতঙ্কের আবহে মানুষ যখন নিদারুণ দুর্দশায়, তখন পুরসভা ও রাজ্য সরকারের অক্ষমতা ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে শুরু হয়েছে প্রবল চাপানউতোর। একদিকে যখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা সিইএসসি-কে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনার জন্য দায়ী করছেন, তখন সরাসরি রাজ্য সরকার ও কলকাতা পৌরসভার ব্যর্থতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন বিরোধীরা।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, হঠাৎ বিপুল বৃষ্টির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি দায় চাপিয়েছেন ডিভিসি ও ফারাক্কার ওপরে। একইসঙ্গে তিনি ঘোষণা করেছেন, রাজ্যের সরকারি স্কুল-কলেজ-অফিস দুদিন ছুটি থাকবে এবং বেসরকারি অফিসগুলিকে ওয়ার্ক ফ্রম হোমে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ক্ষতিপূরণ ও চাকরির আশ্বাস দিয়েছেন। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এই দায়সারা বক্তব্যে প্রশাসনের গাফিলতি আড়াল করার চেষ্টা স্পষ্ট।
কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী সোজাসুজি রাজ্য সরকারকে কাঠগড়ায় তুলে বলেছেন,
“বৃষ্টি তো ভূমিকম্প নয়! আগে থেকে আবহাওয়া দফতরের সতর্কতা ছিল, তবুও কোনো প্রস্তুতি নিল না সরকার। এর নাম অপদার্থতা।”
তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে “উদ্বোধন মন্ত্রী” বলে উল্লেখ করেছেন এবং অভিযোগ তুলেছেন যে খাল-নালা সংস্কারের নামে দুর্নীতি চলছে, বেআইনি প্রোমোটারি রাজে শহরের নিকাশি ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে।
বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন,
“এটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটা সরকারের ব্যর্থতা। আবহাওয়া দফতর আগেভাগেই অরেঞ্জ অ্যালার্ট দিয়েছিল, অথচ রাজ্য সরকার তা উপেক্ষা করেছে। এর নাম লিডারশিপ ফেইলিওর।”
কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ড. সুকান্ত মজুমদার কটাক্ষ করে বলেন,
“দেশের অন্য শহরে জল জমলেও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এত মৃত্যু হয় না। কেন কেবল কলকাতায় বারবার মানুষ মরছে? এর দায় কে নেবে?”
বাম নেতা সুজন চক্রবর্তীও সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে বলেছেন,
“এটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটা একেবারে প্রশাসনিক ব্যর্থতা। ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ড ধ্বংস, খালবিল ভরাট, নিকাশি পাম্প অকেজো—এসব কি প্রকৃতির কাজ? এটা সম্পূর্ণ সরকারের অপদার্থতার ফল।”
তিনি আরও বলেন,
“২০০৭ সালেও ক্লাউডবার্স্ট হয়েছিল, তখন মুখ্যমন্ত্রী একে ম্যানমেড ফ্লাড বলেছিলেন। আজ কেন দায় চাপাচ্ছেন অন্যের ঘাড়ে?”
কলকাতা পুরসভার ব্যর্থতা এখন নগ্নভাবে সামনে এসেছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় নিকাশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নর্দমা ও খালবিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট জলমগ্ন হচ্ছে। কোনো কার্যকরী সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট নেই, আবর্জনায় শহরের চেহারা দুর্বিষহ। অথচ পুরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিম কেবল ঘটনাস্থল ঘুরে দায়সারা মন্তব্য করেছেন।
শহরবাসীর ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। বহু মানুষ বলেছেন, “প্রতি বছরই একই চিত্র। সামান্য বৃষ্টিতেই কলকাতা ডুবে যায়। এর দায় পুরসভা ও রাজ্য সরকারের। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা থমকে যায়, অথচ শাসকেরা কেবল দায় এড়িয়ে যান।”
পুজোর মুখে কলকাতার জলমগ্ন ছবি আবারও প্রমাণ করে দিল—শহরবাসীর দুর্ভোগ প্রশাসনের অযোগ্যতা ও দুর্নীতির সরাসরি ফল। তৃণমূল সরকার দায়সারা বক্তব্যে নিজেদের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেললেও, বিরোধীরা একবাক্যে বলছে—“এটা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটা ম্যানমেড বিপর্যয়।”