নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজিয়ে ১০ দফার নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশ করল তৃণমূল কংগ্রেস। বাংলার প্রতিটি ঘরে উন্নয়নের আলো পৌঁছে দিতে এবং সুশাসনের ধারা অব্যাহত রাখতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ১০টি অঙ্গীকার করেছেন। তবে ইস্তাহার প্রকাশ হতে না হতেই পাল্টা আক্রমণে সরব হয়েছে বিজেপি। ইস্তাহারের ঘোষণাগুলিকে ‘বাস্তববিবর্জিত’ বলে কটাক্ষ করেছেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।

তৃণমূলের ১০ অঙ্গীকার: উন্নয়নের নতুন রূপরেখা
তৃণমূলের এবারের ইস্তাহারে নারী শক্তি, যুব সমাজ এবং কৃষকদের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত ১০টি প্রধান প্রতিশ্রুতি হলো:
১. লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বৃদ্ধি: মা-বোনেদের আর্থিক স্বনির্ভরতায় প্রকল্পের বরাদ্দ আরও ৫০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ শ্রেণির জন্য মাসিক ১,৫০০ টাকা এবং তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য মাসিক ১,৭০০ টাকা সরাসরি অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে।
২. বাংলার যুব-সাথী: কর্মহীন যুবক-যুবতীদের পাশে দাঁড়াতে মাসে ১,৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদানের ধারা অব্যাহত থাকবে।
৩. বিশাল কৃষি বাজেট: কৃষকদের কল্যাণে ৩০,০০০ কোটি টাকার বিশেষ ‘কৃষি বাজেট’ পেশ করার সংকল্প নেওয়া হয়েছে।
৪. আবাস ও পরিশ্রুত পানীয় জল: প্রতিটি পরিবারের জন্য পাকা ছাদ এবং ঘরে ঘরে পানীয় জলের সংযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি।
৫. দুয়ারে চিকিৎসা: ব্লক ও টাউন স্তরে নিয়মিত স্বাস্থ্য শিবিরের মাধ্যমে হাতের নাগালে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হবে।
৬. শিক্ষার আধুনিকীকরণ: ‘বাংলার শিক্ষায়তন’ প্রকল্পের অধীনে সমস্ত সরকারি স্কুলের পরিকাঠামোকে বিশ্বমানের করে তোলা হবে।
৭. বাণিজ্যিক হাব: বাংলাকে পূর্ব ভারতের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে অত্যাধুনিক গ্লোবাল ট্রেড সেন্টার এবং লজিস্টিকস পরিকাঠামো নির্মাণ।
৮. প্রবীণ সুরক্ষা: সকল যোগ্য প্রবীণ নাগরিকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বার্ধক্য ভাতা নিশ্চিত করা।
৯. প্রশাসনিক সংস্কার: প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য রাজ্যে ৭টি নতুন জেলা গঠন এবং পৌরসভার সংখ্যা বৃদ্ধি।
১০. সুশাসনের পথচিত্র: আগামী পাঁচ বছর এই ১০টি স্তম্ভকেই উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের অঙ্গীকার।

“মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি নিছক কল্পনা”: তীব্র আক্রমণ বিজেপির
তৃণমূলের এই ইস্তাহারকে কার্যত নস্যাৎ করে দিয়ে আজ কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে তোপ দাগেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।
শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেন, “মুখ্যমন্ত্রী দুয়ারে চিকিৎসার কথা বলছেন, অথচ জেলা হাসপাতালগুলোতে জীবনদায়ী ওষুধ নেই। সাধারণ মানুষের জন্য হাসপাতালগুলো এখন কেবল ‘রেফারেল সেন্টারে’ পরিণত হয়েছে। সরকারি ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকানে নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে, যা চিকিৎসকরাও ব্যবহার করতে বারণ করছেন।”
বিজেপি সভাপতির অভিযোগ, আধুনিক শিক্ষার কথা বলা হলেও রাজ্যে প্রায় ৮ হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। বহু স্কুলে ছাত্র থাকলেও শিক্ষক নেই, আবার কোথাও শিক্ষক থাকলেও ছাত্র নেই। ‘যুব-সাথী’ প্রকল্পকে উপহাস করে তিনি বলেন, “নিজের কর্মীদের ডিএ (DA) দিতে পারছে না সরকার, আর বেকারদের যৎসামান্য টাকা দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে।”
বিজেপি দাবি করেছে, তৃণমূলের এই ১০টি প্রতিশ্রুতি কেবলই মানুষের চোখ ভোলানোর কৌশল। বিজেপি ক্ষমতায় এলে প্রকৃত উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক কাজ কয়েক দিনের মধ্যেই কার্যকর করা হবে বলে তিনি চ্যালেঞ্জ জানান।
রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূল তাদের জনমুখী প্রকল্পগুলির ওপর ভর করে আবারও মানুষের মন জয়ের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর টাকা বৃদ্ধি একটি বড় মাস্টারস্ট্রোক হতে পারে। অন্যদিকে, বিজেপি তৃণমূলের প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং পরিকাঠামোগত অভাবকে হাতিয়ার করে পালটা প্রচার চালাচ্ছে। ভোটের আগে দুই প্রধান শিবিরের এই বাকযুদ্ধ বাংলার রাজনৈতিক উত্তাপকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।