ভাগীরথীর বুকে বিশ্বসেরা প্রত্যয়! টানা তৃতীয় বার ৮১ কিমি সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন

মুর্শিদাবাদ: প্রতি বছর মুর্শিদাবাদের ভাগীরথী নদী বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ এবং কঠিন সাঁতার প্রতিযোগিতার সাক্ষী থাকে। এই প্রতিযোগিতা শুধু শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা নয়, বরং ধৈর্য, মানসিক দৃঢ়তা এবং আত্মবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। ভারত ও বিদেশের সেরা সাঁতারুরা এখানে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে আসে। এবারও এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতার ৭৯তম বর্ষে এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা গেছে, যেখানে বাংলার এক সাঁতারু তার অদম্য মনোবলের পরিচয় দিয়েছেন।
ভাগীরথীর বুকে রোববার জমজমাট আয়োজনের সাক্ষী থাকল গোটা মুর্শিদাবাদ। বিশ্বের দীর্ঘতম সাঁতার প্রতিযোগিতার (World’s Longest Swimming Marathon) ৭৯তম বর্ষে ফের ইতিহাস গড়লেন বর্ধমানের দুর্গাপুরের প্রত্যয় ভট্টাচার্য। টানা তৃতীয় বার ৮১ কিলোমিটার বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তিনি গড়লেন বিরল হ্যাট্রিক।

আহিরণ ব্যারেজ ঘাট থেকে ভোরে শুরু হয়েছিল এই দুরূহ প্রতিযোগিতা। প্রতিকূল স্রোত, প্রচণ্ড ক্লান্তি এবং তীব্র গরমকে সঙ্গী করে সাঁতারে নামেন ২১ জন দেশি-বিদেশি সাঁতারু। দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড লড়াইয়ের পর বিকেল ৪টে নাগাদ কে এন কলেজ ঘাটে সবার আগে পৌঁছে যান প্রত্যয়।

বাংলাদেশ, স্পেন, দুবাই-সহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রত্যয়ের ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। বিশেষত বাংলাদেশের মহম্মদ নুরুল ইসলাম বেশ কিছুক্ষণ ধরে প্রত্যয়ের কড়া টক্কর দেন। শেষ পর্যন্ত নুরুল ইসলাম ১১ ঘণ্টা ১৬ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে দ্বিতীয় এবং নয়ন আলি ১১ ঘণ্টা ১৯ মিনিট ২ সেকেন্ডে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।

মহিলা ১৯ কিমি বিভাগে কলকাতার মৌবনী পাত্র সবার আগে পৌঁছে গর্বের পালক যোগ করলেন বাংলার ঝুলিতে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছেন বাংলাদেশের মুক্তি খাতুন ও সোনিয়া আক্তার। পুরুষদের ১৯ কিমি বিভাগে কলকাতার গৌরব কাবেরী সোনার পদক জেতেন, বাংলাদেশের ফয়সল আহমেদ ও জুয়েল আহমেদ যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয়।

নিজের হ্যাট্রিক জয়ের পর আবেগতাড়িত প্রত্যয় বলেন—

“ভালো প্রতিযোগী ছিল, বাংলাদেশের একজন সাঁতারু অনেকক্ষণ কাছাকাছি ছিলেন। এতে প্রতিযোগিতা জমে উঠেছিল। হ্যাট্রিক করার ইচ্ছে নিয়েই নামা। সেটা সফল হওয়ায় আনন্দ আরও বেশি।”

তিনি আরও আবেদন জানিয়েছেন, সরকার যেন তাঁকে ইংলিশ চ্যানেল সাঁতারের জন্য স্পন্সর করে। তাঁর কথায়, “দেশের নাম উজ্জ্বল করার সুযোগ চাই।”

প্রত্যয় ভট্টাচার্য

মুর্শিদাবাদ সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে প্রতি বছর আয়োজিত হয় বিশ্বের এই দীর্ঘতম সাঁতার প্রতিযোগিতা। রবিবার ভাগীরথীর দুই পারে হাজারো দর্শকের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।

এবারও অংশ নিয়েছিলেন স্থানীয় প্রতিযোগী তপু সরকার, যিনি গত বছর দ্বিতীয় হয়েছিলেন। তবে মাঝপথে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হয়।

হাজারো প্রতিকূলতা পেরিয়ে ফের বাংলাকে গর্বিত করলেন প্রত্যয় ভট্টাচার্য। ৮১ কিমি দীর্ঘ গঙ্গার বুক চিরে এই জয় শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, গোটা দেশের মুখ উজ্জ্বল করল।

মুর্শিদাবাদের এই ঐতিহ্যবাহী সাঁতার প্রতিযোগিতা আবারও প্রমাণ করল যে, খেলাধুলা শুধু দেশ বা রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি ভারত, বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দেশের সাঁতারুদের মধ্যে এক আন্তর্জাতিক বন্ধন তৈরি করে। প্রত্যয় ভট্টাচার্যের এই ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক শুধু তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়া জগতের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণা। এটি দেখিয়ে দেয় যে, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং সুযোগ পেলে ভারতীয় সাঁতারুরা বিশ্ব মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করতে সক্ষম। এই সাফল্য নতুন প্রজন্মের সাঁতারুদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আশা করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *