“SIR-র নামে NRC করার চক্রান্ত, ভয় পাবেন না, আমি আপনাদের পাহারাদার” বনগাঁর সভায় গর্জন মমতার

নিজস্ব সংবাদদাতা, বনগাঁ: নির্বাচনের দামামা বাজার আগেই বনগাঁর মাটিতে দাঁড়িয়ে বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার বনগাঁর জনসভা থেকে তিনি একাধারে যেমন ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দাগলেন, তেমনই মতুয়া সম্প্রদায় ও সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে বললেন, “যতদিন আমি আছি, আপনাদের গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে না।”

সভার শুরুতেই দেরিতে পৌঁছানোর জন্য ক্ষমা চেয়ে নেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, দীর্ঘ ৭-৮ মাস ধরে তিনি হেলিকপ্টার ব্যবহার করছেন না, সড়কপথেই জেলা সফর করছেন। কিন্তু এদিন সময় বাঁচানোর জন্য সরকারি কপ্টার ব্যবহারের কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে জানানো হয় কপ্টার উড়বে না। একে বিজেপির ‘চক্রান্ত’ বলে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “নির্বাচন শুরু হয়নি, কিন্তু সংঘাত শুরু হয়ে গেছে। আমার কপ্টার খারাপ করে, রাস্তা আটকে আমাকে রোখা যাবে না। আজ সড়কপথে এসে বরং লাভই হলো, বহু মানুষের সঙ্গে সরাসরি জনসংযোগের সুযোগ পেলাম।”

এদিনের সভার মূল বিষয়বস্তু ছিল ভোটার তালিকা সংশোধন বা ‘SIR’ (Special Intensive Revision)। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ২০০২ সালের পর হঠাৎ করে এখন কেন SIR করা হচ্ছে? তিনি বলেন, “আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার কার্ড সব করিয়েও এখন বলা হচ্ছে ওসব চলবে না। আসল ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। এটা বিজেপির কমিশন নয়, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ হওয়া উচিত।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই প্রক্রিয়ার চাপে রাজ্যে বিএলও (BLO)-রা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন। নদিয়ার রিঙ্কু নামে এক বিএলও-র সুইসাইড নোটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অহেতুক চাপে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন বিএলও প্রাণ হারিয়েছেন।

বনগাঁর মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় দাঁড়িয়ে নাগরিকত্ব ইস্যুতে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করেন মমতা। তিনি বলেন, “মতুয়া মহাসংঘের নামে ধর্মের কার্ড খেলবেন না। মনে রাখবেন, যেই আপনি নিজেকে নতুন করে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করবেন, তখনই প্রমাণ হয়ে যাবে আপনি এতদিন অবৈধ ছিলেন। আপনারা তো ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেছেন, তাহলে আপনারা নাগরিক নন কেন?”

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “কাগজে কলমে আপনারা যেই লিখবেন আপনারা মতুয়া বা ওপার বাংলা থেকে এসেছেন, ওরা প্রমাণ করে দেবে আপনারা বাংলাদেশি। ফাঁদে পা দেবেন না।”

বাংলা ভাষা ও উপভাষা নিয়ে বিজেপির বিভাজনমূলক রাজনীতির কড়া জবাব দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ইতিহাস জানুন। বীরভূমের ভাষার টান আর ওপার বাংলার ভাষার টানে মিল আছে। কেউ বাঙাল ভাষায় কথা বললেই সে বাংলাদেশি হয়ে যায় না। বাংলা ভাগ হলেও আমাদের সংস্কৃতি এক। রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়কে নিয়ে অপমানজনক কথা বলার আগে বাংলা সম্পর্কে পড়াশোনা করা উচিত।”

প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে বিজেপি বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন মমতা। তিনি বলেন, “এখন এআই (AI) দিয়ে আমার গলার স্বর নকল করে ফেক ভিডিও বানানো হচ্ছে। আসল মমতা ভোট চাইতে গেলে হয়তো দেখবেন নকল মমতা আগেই কিছু বলে দিয়েছে। এছাড়া যেখানে আমরা জিতি, সেখানে ইভিএম মেশিন খারাপ করে রাখা হয়, যাতে মানুষ বিরক্ত হয়ে ফিরে যায়।”

রাজ্যের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের সঙ্গে বিজেপির প্রতিশ্রুতির তুলনা টেনে তিনি বলেন, “আমরা সব লক্ষ্মীদের টাকা দিই, বাইক বা টিভি আছে কি না দেখি না। আর বিজেপি ভোটের আগে চালের দাম কমায়, ভোট মিটলে বাড়ায়। ১০০ দিনের কাজ, বাংলার বাড়ি, গ্রামীণ সড়কের টাকা কেন্দ্র আটকে রেখেছে। কিন্তু আমরা আমাদের সাধ্যমতো মানুষের পাশে আছি।”

ভাষণের শেষে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, এনআরসি বা ক্যা-র নামে বাংলায় কোনো বিভাজন হতে দেবেন না। তিনি বলেন, “বিজেপি এজেন্সি দিয়ে ভয় দেখাচ্ছে, টাকা ছড়াচ্ছে। কিন্তু মনে রাখবেন, টাকা নিয়ে নিন, কিন্তু ভোট ওদের দেবেন না। আমি ভোট ভিক্ষা করতে আসিনি, আমি আপনাদের পাহারাদার হিসেবে এসেছি। যতদিন তৃণমূল আছে, আপনাদের কেউ তাড়াতে পারবে না!”

এদিনের সভায় ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবেগঘন হয়ে পড়েন এবং বড়মার চিকিৎসার স্মৃতিচারণ করেন। পরীক্ষার মরসুম ও তীব্র গরম উপেক্ষা করেও বনগাঁর সভায় জনসমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *