নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বাংলার রাজনীতির এক দীর্ঘ ও বর্ণময় নক্ষত্রের পতন ঘটল। ২৩শে ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং প্রাক্তন রেলমন্ত্রী মুকুল রায়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তাঁর পুত্র শুভ্রাংশু রায় জানিয়েছেন, রাত ১টা ৩০ মিনিট নাগাদ বার্ধক্যজনিত এবং একাধিক শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর মৃত্যু হয়। সোমবার সকাল থেকেই তাঁর কাঁচরাপাড়ার বাড়িতে শোকের মায়া নেমে এসেছে।
১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত ছিলেন মুকুল রায়। দলের অন্দরে তাঁকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি এবং ‘সংগঠনের কারিগর’ হিসেবে গণ্য করা হতো। প্রায় ১৭ বছর তিনি তৃণমূলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন। ইউপিএ (UPA) আমলে তিনি কেন্দ্রীয় জাহাজ ও বন্দর মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীর রেলভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষুব্ধ হলে, মুকুল রায়কে রেলমন্ত্রী করা হয়। তিনি দায়িত্ব নিয়েই বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহার করেন, যা সে সময় জাতীয় স্তরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
২০১৭ সালে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করে মুকুল রায় তৃণমূল ত্যাগ করেন এবং বিজেপিতে যোগ দেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। তবে নির্বাচনের ঠিক পরেই ১১ জুন ছেলে শুভ্রাংশুকে সাথে নিয়ে পুনরায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে তৃণমূলে ফিরে আসেন তিনি।
তৃণমূলে ফিরলেও খাতায়-কলমে তিনি বিজেপির বিধায়কই থেকে গিয়েছিলেন। ২০২১ সালের জুলাই মাসে তাঁকে বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (PAC) চেয়ারম্যান করা হলে বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। বিরোধী দল বিজেপির আবেদনের ভিত্তিতে কলকাতা হাইকোর্ট তাঁর বিধায়ক পদ খারিজের নির্দেশ দিলেও, চলতি বছরের ১৬ই জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ সেই রায়ের ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করে।
মুকুল রায়ের মৃত্যু বাংলার রাজনীতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতা আগামী প্রজন্মের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে।
পরিবার সূত্রে জানানো হয়েছে, সোমবার বিকেলেই তাঁর মরদেহ উত্তর ২৪ পরগণার কাঁচরাপাড়ার ঘটক রোডের বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে তাঁর অগণিত অনুরাগী ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।