নিজস্ব সংবাদদাতা, বহরমপুর:
‘চেতনায় মানুষ এবং উন্নয়নে মুর্শিদাবাদ’ এই মন্ত্রকে সামনে রেখে সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম এবং মাদকাসক্তির মতো ব্যাধি দূর করতে পথে নামল মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসন। বুধবার বহরমপুরে এক বর্ণাঢ্য পদযাত্রা এবং সচেতনতা শিবিরের মধ্য দিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যে গোটা জেলাকে বাল্যবিবাহ মুক্ত করার শপথ নেওয়া হলো। এই উদ্যোগের মাঝেই বড় সাফল্য হিসেবে জেলার আরও দুটি গ্রাম পঞ্চায়েত—হরিদাসমাটি ও খিদিরপুর-কে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাল্যবিবাহ মুক্ত’ ঘোষণা করা হলো।
এদিন সকাল ১০টা নাগাদ বহরমপুর কালেক্টরেট চত্বর থেকে এক বিশাল সচেতনতামূলক পদযাত্রার সূচনা হয়। অতিরিক্ত জেলাশাসক (উন্নয়ন) চিরন্তন প্রামাণিকের নেতৃত্বে আয়োজিত এই র্যালিতে পা মেলান জেলার বরিষ্ঠ প্রশাসনিক কর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী, আশা ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, এনজিও প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন স্কুলের শত শত ছাত্রছাত্রী। সুসজ্জিত ট্যাবলো, প্ল্যাকার্ড এবং স্লোগানের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, স্কুলছুটদের ক্লাসে ফেরানো এবং মাদক বিরোধী বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। র্যালিটি শহরের রাজপথ পরিক্রমা করে রবীন্দ্র সদনে এসে শেষ হয়।
পদযাত্রা শেষে রবীন্দ্র সদনে শুরু হয় বিশেষ কর্মশালা। প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন জেলাশাসক নীতিন সিঙ্ঘানিয়া। উপস্থিত ছিলেন মুর্শিদাবাদ লোকসভার সাংসদ আবু তাহের খান, রাজ্যের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আখরুজ্জামান, জেলা পরিষদের সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানা, খড়গ্রামের বিধায়ক আশিষ মার্জিত, নওদার বিধায়িকা শাহিনা মমতাজ বেগম সহ অন্যান্যরা।
এদিনের মঞ্চ থেকে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে ‘নির্মল মুর্শিদাবাদ’ গড়ার লক্ষ্যে শপথ নেন। খাদ্য সুরক্ষা, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং স্কুলছুট শিশুদের পুনরায় বিদ্যালয়মুখী করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল হরিদাসমাটি ও খিদিরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতকে ‘বাল্যবিবাহ মুক্ত’ ঘোষণা করা। জেলাশাসক ও অন্যান্য অতিথিরা পর্দা উন্মোচন করে এই ঘোষণা করেন। ভালো কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ দুই পঞ্চায়েতের প্রধানকে পুরস্কৃত করা হয়। পাশাপাশি, যে সমস্ত সাহসী ছাত্রীরা নিজেরা প্রতিবাদ করে নিজেদের বাল্যবিবাহ রুখে দিয়েছে, তাঁদেরও এদিন কুর্নিশ জানায় জেলা প্রশাসন।
জেলাশাসক নীতিন সিঙ্ঘানিয়া তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এই লড়াই কেবল জেলা স্তরে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। তিনি বলেন:
“টিম মুর্শিদাবাদ এগিয়ে চলেছে। শুধু জেলা স্তরে নয়, প্রত্যেক ব্লক এবং স্কুল স্তরে এই ধরনের ওয়ার্কশপ করতে হবে। সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে যে বাল্যবিবাহ একটি অপরাধ এবং এর সঙ্গে যুক্ত থাকলে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমি এডিএম, এসডিও এবং বিডিও-দের নির্দেশ দিচ্ছি, ডেকরেটর থেকে ক্যাটারার—সকলকে এই বিষয়ে সচেতন করতে হবে।”
মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খান বলেন, “আজ বহরমপুর লাগোয়া দুটি পঞ্চায়েত এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হলো। আমাদের লক্ষ্য ২০২৬ সালের মধ্যে জেলার ২৫০টি গ্রাম পঞ্চায়েতেই যাতে একজনও বাল্যবিবাহের শিকার না হয়, সেই শপথ নিতে হবে।”
জেলা পরিষদের সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানা অভিভাবকদের ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “শুধুমাত্র প্রশাসন দিয়ে এই লড়াই জেতা সম্ভব নয়। অভিভাবকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা চাই মুর্শিদাবাদ সম্পূর্ণভাবে বাল্যবিবাহ মুক্ত হোক।”
রাজ্যের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আখরুজ্জামান বলেন ” এই বাল্যবিবাহ রুখতে রাজা রাম মোহনরায় সেই সময় খুব চেষ্টা করেছিলেন, দেশের সরকার কঠোর আইন করেও সেই তিমিরেই রয়েছে। আমাদের মাননীয়া মুখমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এটা রোধ করার জন্য অনেক প্রকল্প নিয়েছে যেমন সবুজসাথী, কন্যাশ্রী, রুপশ্রী আরও অনেক কিছু। এত কিছু করেও আমরা সম্পূর্ণ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে পারিনি। আমরা এই গণমুখী প্রকল্পের মাধ্যমে এটা প্রতিরোধ করতে পেরেছি”
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসন বাল্যবিবাহ মুক্তির রোডম্যাপ প্রকাশ করেছিল এবং ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বহরমপুর ও হরিহরপাড়া ব্লককে বাল্যবিবাহ মুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল। সেই লক্ষ্যের পথেই আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল মুর্শিদাবাদ।