মুর্শিদাবাদে বাল্য বিবাহ রুখতে কড়া প্রশাসন: চলতি বছরেই বন্ধ ৬০০র বেশি বিয়ে, বেড়েছে এফআইআর

নিউজ ফ্রন্ট, মুর্শিদাবাদঃ একসময় বাল্য বিবাহের জন্য রাজ্যের প্রথম সারির জেলাগুলির মধ্যে মুর্শিদাবাদের নাম ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (NFHS-5) অনুসারে, জেলার ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে ৫৫.৪% বাল্য বিবাহের শিকার। তবে সাম্প্রতিককালে, এই উদ্বেগজনক চিত্র বদলাতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসন। শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি নয়, বরং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বাল্য বিবাহ রুখতে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের এই কঠোর নীতির ফলে চলতি বছরেই ৬০০র বেশি বেআইনি বিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে।

৬০০র বেশি বাল্য বিবাহ বন্ধ:

শুক্রবার বহরমপুরে জেলা প্রশাসনিক ভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুর্শিদাবাদের অতিরিক্ত জেলা শাসক (উন্নয়ন) চিরন্তন প্রামাণিক জানান, বাল্য বিবাহ রুখতে প্রশাসন জোরদার অভিযান চালাচ্ছে। ‘চাইল্ড হেল্পলাইন’ এবং সমাজকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে এই অভিযানগুলি চালানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত যেখানে ১৬৩টি বিয়ে বন্ধ করা গিয়েছিল, সেখানে জুন মাসে ২০২টি এবং জুলাই মাসেই ২২৫টি বিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। সব মিলিয়ে এই বছরেই ৬০০রও বেশি বিয়ে আটকানো হয়েছে।

প্রশাসন কেবল বিয়ে আটকানোয় সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত জেলা শাসক জানান, বাল্য বিবাহের ঘটনায় পকসো ধারায় মামলাও দায়ের করা হচ্ছে। এই বছর পকসো ধারায় ৫টি মামলা সহ মোট ১১২টি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে, যা গত বছরের (২০২৪) ৫০টি এফআইআর-এর তুলনায় অনেক বেশি। তিনি বলেন, মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও, না বুঝলে বাধ্য হয়েই এফআইআর দায়ের করতে হচ্ছে। তিনি একটি উদ্বেগজনক ঘটনার কথাও তুলে ধরেন, যেখানে প্রশাসন এক নাবালিকার বিয়ে বন্ধ করলেও, মাত্র ৬ মাসের মধ্যে তার ফের বিয়ে দেওয়া হয় এবং সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। এই ঘটনায় পাত্রের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।

বাল্য বিবাহ রুখতে প্রশাসন ডেকোরেটর ও ক্যাটারারদেরও নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করছে। জেলায় বাল্য বিবাহ ও ড্রপ আউট-মুক্ত ব্লক গড়তে জুন মাস থেকে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে বহরমপুর ও হরিহরপাড়া ব্লকে কাজ শুরু হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই কৃষ্ণ মাটি ও খিদিরপুর নামে দুটি গ্রামকে ‘বাল্য বিবাহ মুক্ত গ্রাম’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এই সব পদক্ষেপের ফলে বাল্য বিবাহ কমছে এবং এর ফলস্বরূপ টিনেজ প্রেগনেন্সিও কমেছে। মে মাসে টিনেজ প্রেগনেন্সি যেখানে ২০% ছিল, জুন মাসে তা কমে ১৮% হয়েছে।

বাল্য বিবাহ রোধে মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার সাফল্যের বিপরীতে জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার চিত্রটি এখনও ভয়াবহ। মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলায় যেখানে ২০২৫ সালে ১১২টি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে, সেখানে জঙ্গিপুরে মাত্র ৪টি এফআইআর হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা শাসক চিরন্তন প্রামাণিক এই বৈষম্যের জন্য কিছুটা প্রশাসনিক গাফিলতি স্বীকার করে নিয়েছেন এবং আশ্বস্ত করেছেন যে আগামী দুই মাসের মধ্যে এই চিত্র বদলে যাবে। তিনি জানান, এই বছর কন্যাশ্রী দিবস জঙ্গিপুরে উদযাপন করা হবে, যা এই অঞ্চলের প্রতি প্রশাসনের নতুন মনোযোগের ইঙ্গিত দেয়।

মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসনের এই ধারাবাহিক ও কঠোর পদক্ষেপ বাল্য বিবাহ নামক সামাজিক ব্যাধি রুখতে এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে। সংখ্যায় প্রমাণ মিলেছে যে, শুধুমাত্র সচেতনতা নয়, আইন প্রয়োগ এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগই এই ধরনের সমস্যা সমাধানে কার্যকরী হতে পারে। যদিও জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার মতো কিছু এলাকায় এখনও নজরদারির ঘাটতি রয়েছে, তবে প্রশাসনের আশ্বাস এবং নতুন পরিকল্পনাগুলি থেকে বোঝা যায় যে, আগামী দিনে পুরো জেলাকে বাল্য বিবাহ মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে তারা বদ্ধপরিকর। এই সম্মিলিত প্রয়াস মুর্শিদাবাদের সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠতে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *