নিউজ ফ্রন্ট, কলকাতাঃ ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ দাঙ্গা ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’–এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত বিবেক অগ্নিহোত্রীর আসন্ন ছবি ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ ট্রেলার লঞ্চকে ঘিরে কলকাতায় তৈরি হলো চূড়ান্ত বিতর্ক ও উত্তেজনা। পরপর দুটি ভেন্যুতে রাজনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক বাধার অভিযোগে অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ায় চলচ্চিত্রজগৎ থেকে শুরু করে রাজনীতির অঙ্গনেও শোরগোল পড়ে গেছে।
প্রথমে দক্ষিণ কলকাতার এক জনপ্রিয় শপিং মল কোয়েস্ট মলে ট্রেলার লঞ্চের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভেন্যু কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ তুলে অনুমতি প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর ছবির টিম শহরের একটি পাঁচতারা হোটেল আইটিসিতে অনুষ্ঠান স্থানান্তরিত করে। কিন্তু সেখানে পৌঁছেও একই পরিস্থিতি—অভিযোগ, হোটেল কর্তৃপক্ষকেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে পড়তে হয়, এবং নিরাপত্তার অজুহাতে অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়।
ফলে, জমকালো ট্রেলার লঞ্চের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়। শেষপর্যন্ত ছবির নির্মাতারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ট্রেলার প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীর অভিযোগ, “আমরা ইতিহাসের এক সত্য তুলে ধরতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কলকাতায় আমাদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা হচ্ছে। কালী মা আর দুর্গা মায়ের রাজ্যে, সত্যজিত রায়ের বাংলায় একজন পরিচালকের গলা চেপে ধরা হচ্ছে—এ আমি কল্পনাও করতে পারিনি। সব ধরনের সরকারি অনুমতি আমাদের কাছে ছিল। অথচ রাজনৈতিক চাপে অনুষ্ঠান বাতিল করানো হলো। এটা গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত।”
অন্যদিকে, শাসকদলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—ছবির বিষয়বস্তু অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এটি সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। তাই শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষার স্বার্থে অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া দেন—“এই বিবেক আসলে বিবেকহীন। উনি বিজেপির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। যদি সত্যিই নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে ধরতে চান, তাহলে গুজরাট ফাইলস, মণিপুর ফাইলস, ইউপি ফাইলস, এমপি ফাইলস বানালেন না কেন? বাংলাকে কেন টার্গেট করা হচ্ছে?”
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই ঘটনাকে “পশ্চিমবঙ্গের জন্য লজ্জার দিন” বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর মতো ভয়াবহ ঐতিহাসিক ঘটনাকে আজও বাংলার মানুষ থেকে আড়াল করা হচ্ছে। ইতিহাস জানার অধিকার জনগণের আছে।”
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও কলকাতায় এক শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে বলেন, “১৯৪৬-এর দাঙ্গায় হিন্দু সমাজকে রক্ষা করেছিলেন শ্রী গোপাল মুখোপাধ্যায়। আজ তাঁর মূর্তি উন্মোচন করা আমাদের পূর্বপুরুষদের সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। এই ইতিহাস কখনও ভুলে গেলে চলবে না।”
‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’-এর মূল গল্প আবর্তিত হয়েছে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট শুরু হওয়া ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’–কে কেন্দ্র করে, যেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান। এই ভয়াবহ অধ্যায়কে ঘিরে আজও নানা বিতর্ক রয়েছে। ফলে ছবিটি মুক্তির আগেই তা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ায় ছবির প্রচারে যেমন আলোড়ন তৈরি হলো, তেমনি আবারও প্রশ্ন উঠলো—বাংলায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আদৌ নিরাপদ কিনা। এর আগেও প্রোপাগান্ডা সিনেমা করে বিতর্কে জড়িয়েছেন। বিবেক অগ্নিহোত্রীর চলচ্চিত্রগুলি ক্রমাগত দর্শকদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে চলেছে। একদল যেখানে ছবিগুলোকে ‘সত্য উন্মোচনকারী’ হিসেবে প্রশংসা করে, সেখানে অন্যদল সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে নিন্দা করে। এই ধারাবাহিক বিতর্ক তাকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।