নিউজ ফ্রন্ট, মুর্শিদাবাদ, ১৬ সেপ্টেম্বর:
আপনি কি ই-কমার্স সাইটে কোনো পণ্য অর্ডার করার পর ডেলিভারি পাননি, আর আপনার কাছে শুধু ‘ডেলিভারি ব্যর্থ’ হওয়ার মেসেজ এসেছে? তাহলে সাবধান! মুর্শিদাবাদের নওদায় এমনই এক ভয়াবহ ই-কমার্স প্রতারণা চক্রের পর্দাফাঁস করল পুলিশ। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সোমবার গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে একটি গাড়ি থেকে প্রায় ৬ লক্ষ টাকার চুরি যাওয়া অ্যামাজন পণ্য উদ্ধার করা হয়েছে এবং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কীভাবে ধরা পড়ল চক্র?
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার গভীর রাতে নওদা থানার অন্তর্গত পাটিকাবাড়ি হাইস্কুলের সামনে বিশেষ নাকা চেকিং চালানো হয়। সন্দেহজনক একটি ইকো ভ্যানকে আটকানো হয়। গাড়িটি নদীয়া থেকে মুর্শিদাবাদের দিকে আসছিল। গাড়ি তল্লাশি করতে গিয়েই বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য— ভ্যান ভর্তি অ্যামাজনের প্যাকেজড সামগ্রী!
গাড়ির চালক রসিদুল বিশ্বাস (২৫) এবং তার সঙ্গী সলমন মণ্ডল (১৮)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি এবং তাদের বক্তব্যেও অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এর পরেই দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধ্রত রসিদুল বিশ্বাসের বাড়ি ডোমকলের কুশাবাড়িয়া এবং সলমন মণ্ডলের বাড়ি ডোমকলের মুরালিপুর গ্রামে।
কী কী বাজেয়াপ্ত হয়েছে?
পুলিশ সূত্রে খবর, ভ্যান থেকে উদ্ধার হয় প্রায় ২৪ রকমের জিনিসপত্র, যার মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রিক মোটর, হ্যান্ড ড্রিল মেশিন, ওয়াটার পাম্প, মার্বেল কাটিং মেশিন, ডাইয়িং মেশিন, পাম্প সেট, ব্র্যান্ডেড জুতো ও অন্যান্য সামগ্রী। সব মিলিয়ে বাজেয়াপ্ত সামগ্রীর বাজারমূল্য আনুমানিক ৬ লক্ষ টাকা। ভ্যানটিকেও পুলিশ জব্দ করেছে।
চক্র কীভাবে কাজ করত?
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বড় ই-কমার্স সাইটগুলির রিটার্ন পলিসি-কে হাতিয়ার করেই গড়ে উঠেছিল এই প্রতারণা চক্র। যেসব প্রোডাক্ট গ্রাহক ফেরত দিতেন, সেগুলি কোম্পানির গুদামে না গিয়ে বাইরে বিক্রি হয়ে যেত। ফলে গ্রাহক সামগ্রী পান না, আবার কোম্পানিও ফেরত জিনিস হাতে পায় না।
মঙ্গলবার বেলডাঙার এসডিপিও উত্তম গড়াই বলেন—
“ধৃত দু’জন ডোমকল এলাকার বাসিন্দা। এরা আগেও অপরাধমূলক কাজে জড়িত ছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে। আরও কয়েকজনের নাম পুলিশের হাতে এসেছে। চক্রে কারা কারা যুক্ত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
তিনি জনসাধারণকে সতর্ক করে আরও বলেন—
“অনলাইনে কেনাকাটা করার সময় সাবধান হতে হবে। ক্যাশ অন ডেলিভারির ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় ‘প্রোডাক্ট ডেলিভারি করা যায়নি’ বা ফোন ধরছে না— এগুলো সব অসাধু চক্রের কৌশল। পুলিশ চেষ্টা করছে যাতে জড়িত সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা যায়।”
ঘটনায় নওদা থানায় নির্দিষ্ট মামলা রুজু হয়েছে। ধৃতদের মঙ্গলবার আদালতে তোলা হলে ১০ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ মেলে।
অনলাইন কেনাকাটার আড়ালে প্রতারণার এই নতুন কৌশল ইতিমধ্যেই সারা দেশে বিস্তার লাভ করেছে। তবে মুর্শিদাবাদের মতো অপেক্ষাকৃত প্রত্যন্ত জেলায় এই ধরনের একটি চক্রের পর্দাফাঁস নিঃসন্দেহে বিরল এবং তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে এটি পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতা ও দক্ষতার পরিচয় বহন করে, অন্যদিকে এও ইঙ্গিত দেয় যে সাইবার অপরাধ এখন আর শুধুমাত্র শহরকেন্দ্রিক নয়—গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এর শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হচ্ছে।
এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ছোট শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষও ক্রমশ আধুনিক সাইবার প্রতারণার জালে জড়িয়ে পড়ছেন। পুলিশ যদি এই চক্রের মূলচক্রী ও পাণ্ডাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়, তবে তা কেবল মুর্শিদাবাদ নয়, গোটা রাজ্য তথা জাতীয় স্তরেই ই-কমার্স নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে।