নিউজ ফ্রন্ট | নয়াদিল্লি, ১৬ সেপ্টেম্বর
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন অক্ষরেখা টানল সৌদি আরব–পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি। রিয়াধে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একসঙ্গে স্বাক্ষর করলেন “স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট”-এ। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নতুন কাঠামো পেল।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, এই চুক্তির আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
পাকিস্তানের জন্য সৌদির কূটনৈতিক হাত
পাহেলগামের সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তান আন্তর্জাতিক পরিসরে কোণঠাসা। ভারত একাধিক আন্তর্জাতিক ফোরামে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদে মদতদাতা দেশ হিসেবে তুলে ধরছে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ রিয়াধ সফরে নজিরবিহীন অভ্যর্থনা পান। রয়্যাল সৌদি এয়ারফোর্স তাঁর বিমানের স্কর্ট করে এবং সৌদি সেনা তাঁকে বিশেষ গার্ড অব অনার দেয়। পরে এক্স-এ (X, পূর্বতন টুইটার) তিনি লেখেন—
“আমার প্রিয় ভাই সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের উষ্ণ অভ্যর্থনা আমাদের দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী ভালবাসা ও সম্মানের প্রতীক। আজকের বৈঠকে আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ থেকে শুরু করে বিনিয়োগ ও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমি নিশ্চিত, সৌদি–পাকিস্তান সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও উচ্চতায় পৌঁছাবে।”

চুক্তির মূল দিক
- পারস্পরিক প্রতিরক্ষা: কোনো এক দেশের উপর আক্রমণ হলে, সেটিকে উভয় দেশের উপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
- সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি: প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তা।
- বিতর্কিত ধারা: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মতে, প্রয়োজনে সৌদি আরব পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পাবে—যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন—
“ভারত তার সর্বাত্মক জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তির দিকগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, এই চুক্তি নতুন নয় এবং দীর্ঘদিন ধরে আলোচনাধীন ছিল। তবুও, আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্নে দিল্লি এই ঘটনার উপর কড়া নজর রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
- সৌদি আরব তার পশ্চিম এশিয়ায় নেতৃত্ব আরও জোরদার করতে চাইছে। পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি মুসলিম বিশ্বের ঐক্য প্রদর্শনের এক কূটনৈতিক চাল।
- পাকিস্তানের জন্য এটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে কূটনৈতিক পুনর্বাসন। অর্থনৈতিক সঙ্কট ও আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে ইসলামাবাদ সৌদির সমর্থনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
- ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, বিশেষ করে যদি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো পাকিস্তানের মদত পায়।
সৌদি–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি নিঃসন্দেহে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পাকিস্তান সৌদির ঘনিষ্ঠ সমর্থন পেলেও, ভারত ইতিমধ্যেই অর্থনীতি, জ্বালানি ও কূটনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে রিয়াধের সঙ্গে নিজস্ব সম্পর্ক দৃঢ় করেছে।
আগামী দিনে নজর থাকবে— এই চুক্তি কতটা কার্যকর হয়, সৌদি আসলেই পাকিস্তানের কৌশলগত অংশীদার হয়ে ওঠে কি না, এবং এর প্রভাব ভারতের নিরাপত্তা পরিবেশে কতটা গভীর হয়।