নিজস্ব সংবাদদাতা, সাগরদিঘি: ‘রক্ষকই ভক্ষক’ প্রবাদটি যেন বাস্তবে রূপ নিল মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতে। পারিবারিক অশান্তির জেরে স্ত্রীর ওপর প্রতিশোধ নিতে সরকারি পদের চরম অপব্যবহার করলেন এক ব্যক্তি। বিএলও (BLO)-র দায়িত্বে থাকা স্বামী নিজের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে জীবিত স্ত্রীকেই ভোটার তালিকায় ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করে দিলেন! অদ্ভুত ও গুরুতর এই অভিযোগটি উঠেছে সাগরদিঘি থানার বালিয়া পিলকি গ্রামে। অভিযুক্ত স্বামীর নাম প্রভাকর মণ্ডল।
স্থানীয় সূত্রে খবর, অভিযুক্ত প্রভাকর মণ্ডল পেশায় পিলকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পার্শ্বশিক্ষক এবং স্থানীয় ১৪৯ নম্বর বুথের দীর্ঘদিনের বিএলও। তাঁর স্ত্রী টুম্পা দাস। ২০২৩ সাল পর্যন্ত সংসার ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের শুরু থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক অশান্তি চরমে ওঠে। বিবাদের জেরে স্বামীর ঘর ছেড়ে টুম্পা চলে যান সুতির আমুহা কদমতলা গ্রামে তাঁর বাবার বাড়িতে। বর্তমানে তিনি সেখানেই বসবাস করছেন।
কীভাবে সামনে এল জালিয়াতি?
সম্প্রতি ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ বা এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ভোটারদের বাড়িতে ভেরিফিকেশন বা ফর্ম পৌঁছানোর কথা। কিন্তু টুম্পা দাস কোনো ফর্ম পাননি। সন্দেহ হওয়ায় তিনি ভোটার তালিকা পরীক্ষা করতে যান। তখনই তাঁর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তিনি দেখেন, সাগরদিঘির ১৪৯ নম্বর বুথের ভোটার তালিকায় তাঁর নামের ওপর ‘ডিলিটেড’ (Deleted) স্ট্যাম্প মারা হয়েছে। অর্থাৎ, সরকারি নথিতে তাঁকে ‘মৃত’ হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং অভিযোগ সেই রিপোর্ট জমা দিয়েছেন খোদ তাঁর স্বামী তথা ওই এলাকার বিএলও প্রভাকর মণ্ডল।
নিজের বেঁচে থাকার প্রমাণ দিতে এবং স্বামীর এই কীর্তির বিরুদ্ধে বিচার চাইতে শুক্রবার বাবার সঙ্গে সোজা জঙ্গিপুর মহকুমা শাসকের দপ্তরে হাজির হন টুম্পা। মহকুমা শাসক (SDO) গাদ্দাম সুধীরকুমার রেড্ডির কাছে তিনি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
টুম্পা দাস বলেন, “পারিবারিক রাগের বশেই ও (স্বামী) আমাকে মৃত সাজিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়েছে। আমি যাতে ভোট দিতে না পারি বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা না পাই, তাই এই চক্রান্ত করেছে।”
জীবিত মহিলাকে মৃত ঘোষণার এই অভিযোগ শুনে বিস্মিত হন মহকুমা শাসক। তিনি কালবিলম্ব না করে সাগরদিঘির বিডিও-কে ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দেন। এসডিও-র নির্দেশে শুক্রবারই অভিযুক্ত বিএলও প্রভাকর মণ্ডলকে সাগরদিঘি ব্লক অফিসে তলব করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মেলার পর তাঁকে শো-কজ (Show-cause) করা হয়েছে।
ঘটনাটি জানাজানি হতেই এলাকায় শোরগোল পড়ে গেছে। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মী (বিএলও) কীভাবে ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথি বিকৃত করতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রশাসন সূত্রে খবর, অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওই পার্শ্বশিক্ষকের বিরুদ্ধে কড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।