‘ইভিএম নয়, ভোট চুরি হচ্ছে ভোটার তালিকায়’: দিল্লির বুকে নির্বাচন কমিশনকে নজিরবিহীন আক্রমণ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের

নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি | ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল আজ দিল্লিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ বেঞ্চের সঙ্গে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বেরিয়ে এসে সাংবাদিক সম্মেলনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিস্ফোরক অভিযোগ করেন। তাঁর স্পষ্ট দাবি, ইভিএম নয়, আদতে ভোটার তালিকায় কারচুপি করেই একের পর এক নির্বাচনে ‘স্ট্রাইক রেট’ বাড়াচ্ছে বিজেপি।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, নির্বাচন কমিশন নিজেই স্বীকার করেছে যে বাংলার প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারের তথ্যে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি রয়েছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বয়সের অযৌক্তিক ফারাক, দাদু-ঠাকুমার বয়সের গরমিল এবং বানান বিভ্রাট। এই বিশাল তালিকা কেন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে না? কেন কমিশন এই স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ?

অভিষেক অভিযোগ করেন, বুথ স্তরের আধিকারিকদের (AERO) জন্য যে বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে চরম ত্রুটি রয়েছে। কোনও ভোটারের নথি সঠিক পেয়ে আধিকারিক যদি “Found OK” অপশন সিলেক্ট করেন, তবুও যান্ত্রিকভাবে তাঁর কাছে শুনানির নোটিশ চলে যাচ্ছে। কমিশন এই প্রযুক্তিগত ত্রুটির কথা স্বীকার করলেও এর কোনও সমাধান দিতে পারেনি।

এদিনের বৈঠকে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে বাংলার ভোটার তালিকার সমীক্ষায় ‘Data Mission’ নামক একটি তৃতীয় পক্ষের (Third Party) এজেন্সির নিয়োগ নিয়ে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এই নিয়োগ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।

“খোদ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে না জানিয়ে একটি রাজ্যে কীভাবে একটি বেসরকারি সংস্থাকে ভোটার তালিকার মতো সংবেদনশীল কাজে লাগানো সম্ভব?”— প্রশ্ন তোলেন অভিষেক। পরে তৃণমূলের পক্ষ থেকে এই সংক্রান্ত নথি কমিশনের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মানবিকতার খাতিরে তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয় বর্তমানে ৮৫ বছরের ঊর্ধ্বদের সশরীরে হাজিরায় ছাড় দেওয়া হলেও, তৃণমূল দাবি করেছে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বের অসুস্থ এবং বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদেরও এই তালিকায় আনতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট বা হাই কোর্টে ভার্চুয়াল শুনানি সম্ভব হলে, নির্বাচন কমিশন কেন পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য তা করতে পারবে না? বিহারের শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে নথি যাচাইয়ের অনুমতি দেওয়া হলেও বাংলার ক্ষেত্রে কেন ‘সশরীরে হাজিরা’ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে, তা নিয়ে ‘বিমাতৃসুলভ আচরণের’ অভিযোগ তোলেন তিনি।

পশ্চিমবঙ্গকে কি বিশেষ লক্ষ্যে নিশানা করা হচ্ছে?

অভিষেক পরিসংখ্যান দিয়ে দেখান যে, তামিলনাড়ু (১২.৫৭%), গুজরাত (৯.৯৫%) বা ছত্তিশগড়ে (৮.৭৬%) ভোটার নাম বাদের হার বাংলার (৫.৭৯%) চেয়ে অনেক বেশি। তবুও কেন শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই অতিরিক্ত মাইক্রো-অবজারভার এবং জেলা পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে, তার কোনও সদুত্তর কমিশন দিতে পারেনি।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস, আরজেডি এবং আপ-এর মতো বিরোধী দলগুলোকে সতর্ক করে বলেন, বিজেপি এখন ভোটার তালিকার সফটওয়্যার নিয়ে খেলা করছে। মহারাষ্ট্রে মাত্র ৪ মাসে ৪০ লক্ষ এবং দিল্লিতে ১০ মাসে ২০ হাজার ভোটার যুক্ত করার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এটাই বিজেপির জয়ের আসল ফর্মুলা। তাঁর মন্তব্য, “আগে ভোটাররা ঠিক করত কারা ক্ষমতায় থাকবে, এখন যারা ক্ষমতায় আছে তারা ঠিক করছে কারা ভোট দেবে।”

বৈঠকের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, যুক্তিতে হার মানায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার তাঁর দিকে আঙুল তুলে কথা বলেন এবং মেজাজ হারান। অভিষেক পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন, “যদি সাহস থাকে তবে আড়াই ঘণ্টার বৈঠকের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করুন। আমি কোনও মনোনীত আধিকারিক নই, আমি জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। আমি আমার ভোটারদের কাছে দায়বদ্ধ।”

এদিন অভিষেককে পাল্টা কটাক্ষ করেছেন কংগ্রেস এর CWC সদস্য অধীর রঞ্জন চৌধুরী তিনি বলেন “স্কুলজীবনে পড়াশোনায় দুর্বল ছাত্ররা যেমন সামনের সারির মেধাবীদের দেখে ‘টুকলি’ করে, রাজনীতির ময়দানেও আজ এক ‘চোথা-করা’ নেতার দেখা মিলল। এই খোকাবাবু প্রমাণ করলেন তিনি আসলে অন্যের কথা নকল করছেন। রাহুল গান্ধী যখন তথ্য-প্রমাণসহ প্রথম ভোট চুরির অভিযোগ তুলেছিলেন, তখন গোটা দেশ আলোড়িত হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু আজ এই খোকাবাবু যা বলছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রয়োজনই বোধ করেনি। কারণ তারা জানে, তাঁর বক্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ভাঙিয়ে চলা এই নেতার রাহুল গান্ধীর সঙ্গে নিজেকে তুলনা করাটা হাস্যকর।“

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দিল্লি সফর এবং সরাসরি কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ করা ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে হাতিয়ার করে তৃণমূল এখন জাতীয় স্তরে বিজেপির ‘নির্বাচনী কৌশল’ ফাঁস করতে মরিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *