কয়লা তস্করি মামলায় ইডির তল্লাশি ও মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা ঘিরে তীব্র সংঘাত

নিউজ ফ্রন্ট, কলকাতাঃ

কয়লা তস্করি ও অর্থপাচার সংক্রান্ত মামলায় পশ্চিমবঙ্গে ইডির তল্লাশি অভিযানকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) মনি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন (PMLA) অনুযায়ী বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গে ছ’টি ও দিল্লিতে চারটি মিলিয়ে মোট দশটি জায়গায় একযোগে তল্লাশি চালায়। এই অভিযানের কেন্দ্রে রয়েছে কয়লা তস্করি চক্রের আর্থিক লেনদেন এবং তার সঙ্গে যুক্ত হাওয়ালা নেটওয়ার্ক।

ইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে সিবিআই দায়ের করা কয়লা তস্করি মামলার ভিত্তিতেই এই তদন্ত। অভিযোগ অনুযায়ী, অনুপ মাঝি ওরফে ‘লালা’র নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল সংলগ্ন ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেডের লিজহোল্ড এলাকা থেকে অবৈধভাবে কয়লা উত্তোলন করত। সেই কয়লা বাঁকুড়া, বর্ধমান, পুরুলিয়া-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিক্রি করা হত। এই অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় হয়েছে বলে দাবি তদন্তকারী সংস্থার।

ইডির অভিযোগ, কয়লা তস্করি থেকে প্রাপ্ত অর্থ হাওয়ালা মারফত বিভিন্ন সংস্থায় পাঠানো হয়। সেই সূত্রেই রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাকের রেজিস্টার্ড সংস্থা Indian PAC Consulting Pvt Ltd-এর আর্থিক লেনদেন তদন্তের আওতায় আসে। এর জেরেই ইডি তল্লাশি চালায় আই-প্যাকের অফিস এবং সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈন–এর বাসভবনে।

ইডির বক্তব্য অনুযায়ী, তল্লাশি অভিযান শুরুতে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও আইনানুগভাবে চলছিল। কিন্তু সংস্থার অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকদের নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ইডির দাবি, ওই সময় দুটি জায়গা থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়া হয়, যার ফলে তদন্তে গুরুতর বাধা সৃষ্টি হয়েছে।

এই অভিযোগের ভিত্তিতেই ইডি কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। ইডির আইনজীবী ধীরজ ত্রিবেদী বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের বেঞ্চে জানান, মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্য পুলিশের ভূমিকা তদন্ত প্রক্রিয়ায় বেআইনি হস্তক্ষেপের শামিল। আদালতের কাছে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের আবেদন জানানো হয়েছে। আদালত মামলাটি নথিভুক্ত করার অনুমতি দিয়েছে এবং শীঘ্রই শুনানি হতে পারে।

অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইডির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এই তল্লাশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসকে হেনস্থা করার চেষ্টা। তাঁর দাবি, আই-প্যাকের দপ্তর দলের আইটি সেলের কাজেও ব্যবহৃত হয় এবং যে নথিগুলি সরানো হয়েছে, সেগুলি দলের নিজস্ব।

এই বক্তব্য ঘিরেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—একটি বেসরকারি রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থার অফিসে কেন একটি রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নথি রাখা ছিল।

এই ইস্যুতে কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, আই-প্যাক তৃণমূল কংগ্রেসের “চোখ ও কান” হিসেবে কাজ করে এবং নির্বাচনী কৌশল, বুথ ম্যানেজমেন্ট ও ভোটার প্রভাবিত করার নানা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। অধীরের দাবি, আই-প্যাকের মাধ্যমেই তৃণমূল নির্বাচনী ফায়দা তোলে এবং অর্থনৈতিক লাভ করে।

সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, “সরকারি কাজে বাধা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বেআইনি কাজ করেছেন। কলকাতা ও বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট এবং রাজ্য পুলিশের ডিজিপি এই বেআইনি কাজে সহযোগিতা করেছেন।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, তল্লাশির সময় মুখ্যমন্ত্রী কেন নিজে পুলিশ নিয়ে গিয়ে নথি সরালেন এবং কেন সেই নথি তৃণমূল কংগ্রেসের নামে রেজিস্টার্ড গাড়িতে তোলা হল।

বিজেপির বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও এই ঘটনাকে “প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা” বলে কটাক্ষ করেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অবশ্য এই সমস্ত অভিযোগ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দলের দাবি, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে রাজ্য সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।

সব মিলিয়ে, কয়লা তস্করি মামলায় ইডির তল্লাশি, মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা এবং তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এখন বিচারাধীন। কলকাতা হাই কোর্টের শুনানি এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার পরবর্তী পদক্ষেপ রাজ্য রাজনীতিতে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *