সামসেরগঞ্জে বাবা-ছেলে খুনে ১৩ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

নিউজ ফ্রন্ট, জঙ্গিপুর, ২৩ ডিসেম্বর:

মুর্শিদাবাদের সামসেরগঞ্জে ওয়াকফ আন্দোলনের সময়ে বাবা-ছেলে খুনের মামলায় ঐতিহাসিক রায় দিল আদালত। গত ১২ এপ্রিলের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ১৩ জনকেই দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন জঙ্গিপুর আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক (প্রথম আদালত) অমিতাভ মুখার্জি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নতুন ফৌজদারি বিধি অর্থাৎ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) ১০৩(২) ধারায় ‘মব লিঞ্চিং’ বা গণপিটুনি সংক্রান্ত অপরাধে এটি গোটা দেশে দ্বিতীয় কোনো সাজা ঘোষণার ঘটনা।

চলতি বছরের ১২ এপ্রিল ওয়াকফ সংশোধিত আইনের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল সামসেরগঞ্জের জাফরাবাদ। অভিযোগ, সেই উত্তেজনার সুযোগ নিয়ে একদল উন্মত্ত জনতা জাফরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা হরগোবিন্দ দাস এবং তাঁর ছেলে চন্দন দাসকে বাড়ি থেকে টেনে বের করে আনে। এরপর প্রকাশ্য দিবালোকে বাবা ও ছেলেকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুন করা হয়।

এই জোড়া খুনের তদন্তে রাজ্য একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করেছিল। অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তদন্ত শেষ করে পুলিশ। এই মামলায় জয় নিশ্চিত করতে বেশ কিছু আধুনিক ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়

  • গেইট প্যাটার্ন বিশ্লেষণ (Gait Pattern Analysis): সিসিটিভি ফুটেজে থাকা ব্যক্তিদের হাঁটার ধরনের সঙ্গে ধৃতদের হাঁটার ধরন মিলিয়ে অকাট্য প্রমাণ তৈরি করা হয়।
  • গুগল ম্যাপস ও সিডিআর ম্যাপিং: অভিযুক্তদের মোবাইলের লোকেশন এবং টাওয়ার ডিটেলস গুগল ম্যাপে প্লট করে অপরাধস্থলে তাঁদের উপস্থিতি প্রমাণ করা হয়।
  • ডিএনএ প্রোফাইলিং: উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ও দা-তে লেগে থাকা রক্তের ডিএনএ-র সঙ্গে মৃত ব্যক্তিদের ডিএনএ হুবহু মিলে যায়।

নতুন আইন অর্থাৎ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অধীনে এটি একটি নজিরবিহীন রায়। দণ্ডিতদের বিরুদ্ধে নিম্নলিখিত ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে ১০৩(২) ধারা: সংঘবদ্ধভাবে খুন বা মব লিঞ্চিং। ৩১০(২) ও ৩৩১(৫) ধারা: ডাকাতি এবং অন্যের বাড়িতে বলপূর্বক প্রবেশ। ১৯১(৩) ও ১১৫(২) ধারা: মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা এবং আঘাত করা। এছাড়াও জোর করে আটকে রাখা (১২৬-২) এবং দলবদ্ধ অপরাধের ধারা যুক্ত করা হয়েছে।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ১৩ জন হলো: ১. দিলদার নদাব (২৮), ২. আসমাউল নদাব ওরফে কালু (২৭), ৩. এনজামুল হক ওরফে বাবলু (২৭), ৪. জিয়াউল হক (৪৫), ৫. ফেকারুল সেখ ওরফে মহক (২৫), ৬. আজফারুল সেখ ওরফে বিলাই (২৪), ৭. মনিরুল সেখ ওরফে মনি (৩৯), ৮. একবাল সেখ (২৮), ৯. নুরুল ইসলাম (২৩), ১০. সাবা করিম (২৫), ১১. হযরত সেখ ওরফে হযরত আলী (৩৬), ১২. আকবর আলী ওরফে একবর সেখ (৩০) এবং ১৩. ইউসুফ সেখ (৪৯)।

ধৃতদের ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বীরভূম এবং হাওড়া-সহ বিভিন্ন রাজ্য ও জেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আজ মঙ্গলবার কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আসামিদের জঙ্গিপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হলে বিচারক এই চরম সাজা ঘোষণা করেন। এই রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা। আইনজ্ঞদের মতে, এই সাজা সমাজে কড়া বার্তা দেবে যে, উন্মত্ত জনতা হয়ে আইন হাতে তুলে নিলে পার পাওয়া অসম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *