বড়ঞার ডাকবাংলা হাটে বিজেপির পরিবর্তন সংকল্প সভাসংখ্যালঘু ভোটে নজর, তৃণমূলকে সরাসরি আক্রমণে শুভেন্দু অধিকারী

নিউজ ফ্রন্ট , মুর্শিদাবাদ: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে মুর্শিদাবাদের মাটিতে বড়সড় রাজনৈতিক কর্মসূচির সূচনা করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার বড়ঞা ব্লকের ডাকবাংলা হাট ময়দানে আয়োজিত বিজেপির ‘পরিবর্তন সংকল্প সভা’ থেকে একদিকে যেমন সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ককে কাছে টানতে নজিরবিহীন কৌশল নিলেন শুভেন্দু, অন্যদিকে নিয়োগ দুর্নীতি থেকে পরিযায়ী শ্রমিক একাধিক ইস্যুতে রাজ্য সরকারকে কার্যত তুলোধোনা করলেন।

রাজনৈতিক মহলের মতে, মুর্শিদাবাদ জেলায় বিজেপির সংগঠন মজবুত করতে এবং লোকসভা ভোটের লিডকে বিধানসভায় জয়ে রূপান্তরিত করতেই বড়ঞাকে বেছে নিয়েছেন বিরোধী দলনেতা।

মুর্শিদাবাদের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলায় দাঁড়িয়ে বিজেপির চিরাচরিত হিন্দুত্ববাদী স্লোগানের বাইরে বেরিয়ে এদিন এক ভিন্ন সুর শোনা গেল শুভেন্দু অধিকারীর গলায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি বিজেপির এক সুচিন্তিত কৌশল। সভা মঞ্চ থেকে সংখ্যালঘুদের বার্তা দিয়ে শুভেন্দু বলেন,

জয় শ্রীরাম বলার দরকার নেই, প্রয়োজনে ভারত মাতার জয় বলুন।”

শুভেন্দুর এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ধর্মীয় মেরুকরণের উর্ধ্বে উঠে জাতীয়তাবাদের মন্ত্রেই আগামী দিনে মুর্শিদাবাদে ঘাসফুল ফোটাতে চাইছে বিজেপি। তিনি স্পষ্ট জানান, বড়ঞায় পদ্ম ফোটাতে তিনি নিজে পাড়ায় পাড়ায়, অলিতে-গলিতে ঘুরবেন।

সভার শুরু থেকেই শাসক দলকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন নন্দীগ্রামের বিধায়ক। বড়ঞার বর্তমান বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহা (যিনি নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় বর্তমানে জেলবন্দি) এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতা মাহে আলমের নাম না করে কটাক্ষ ছুড়ে দেন তিনি।

শুভেন্দু বলেন, মুর্শিদাবাদ একসময় কংগ্রেসের দুর্গ ছিল, সিপিএমের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু তৃণমূল এই জেলায় রাজনীতিকে ব্যবসায় পরিণত করেছে। সিপিএমের আমলেও যা হয়নি, তৃণমূল জমানায় তাই হচ্ছে। এরা সরকারি দপ্তরকে ব্যবহার করে বালি চুরি, টোটো কেলেঙ্কারি এবং সিন্ডিকেট রাজ চালাচ্ছে।”

মুর্শিদাবাদের অন্যতম জ্বলন্ত সমস্যা ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ ইস্যুকে হাতিয়ার করে মমতার সরকারকে বিঁধলেন শুভেন্দু। ওড়িশা এবং বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মজুরির তুলনা টেনে তিনি বলেন এখানে কাজের দরে মানুষ ৩০০ টাকা পান, আর ওড়িশায় হেল্পাররাও দিনে ১০০০ টাকা রোজগার করেন। পেটের টানে জেলার প্রায় ১২-১৪ লক্ষ মানুষ আজ ঘরছাড়া। আমি নির্বাচনের আগে প্রতিটি বিধানসভায় পরিযায়ী শ্রমিকদের তালিকা প্রকাশ করব।”

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন আমাকে দায়িত্ব দিন, আমি বদলাব। কিন্তু তিনি মানুষকে ঠকিয়েছেন। হাসপাতালের বেড নেই, স্কুল-কলেজে অনার্সের আসন ফাঁকা, আর ধান মান্ডিতে ফড়েদের রাজত্ব। ৩১০০ টাকার ধান চাষিকে বেচতে হচ্ছে ৯০০-১০০০ টাকায়।”

এদিন টোটো চালকদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে শুভেন্দু অভিযোগ করেন, আরটিসি এবং পরিবহন দপ্তরকে নামিয়ে গরিব টোটো চালকদের পেটে লাথি মারছে সরকার। শোরুমের সঙ্গে বখরা করে টোটো চালকদের থেকে চাঁদা তোলা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। পাশাপাশি ‘স্বাস্থ্যসাথী’ কার্ডকে অকেজো দাবি করে রাজ্যে কেন ‘আয়ুষ্মান ভারত’ চালু হবে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

লোকসভা নির্বাচনে বড়ঞা বিধানসভায় বিজেপির লিড ছিল। সেই পরিসংখ্যানকে হাতিয়ার করে আত্মবিশ্বাসী শুভেন্দু ঘোষণা করেন, “বড়ঞার সিট বিজেপির সিট। মমতাকে নন্দীগ্রামে হারিয়েছি, ২০২৬-এ ভবানীপুরে হারাব। ২৬-এ মমতাকে গোল্লা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে।”

এদিনের সভায় শুভেন্দু অধিকারী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তমলুকের সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, বহরমপুরের বিধায়ক সুব্রত মৈত্র, সাংগঠনিক জেলা সভাপতি মলয় মহাজন সহ একঝাঁক জেলা নেতৃত্ব।

বড়ঞাকে বেছে নেওয়া এবং শুভেন্দুর এই ‘সংকল্প সভা’ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দুর্নীতি মামলায় স্থানীয় বিধায়কের জেলে থাকা এবং লোকসভা ভোটের ফলাফলের নিরিখে এই কেন্দ্রটি বিজেপির কাছে ‘উর্বর জমি’। তবে শুধুমাত্র হিন্দু ভোটে যে বৈতরণী পার হওয়া যাবে না, তা বিলক্ষণ জানেন বিরোধী দলনেতা। তাই আক্রমণের ধার বজায় রেখেও, সংখ্যালঘু মন পেতে ‘ভারত মাতা’র স্লোগান দিয়ে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন শুভেন্দু অধিকারী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *