নিজস্ব সংবাদদাতা, বেলডাঙা | ২৬ নভেম্বর ২০২৫
আগামী ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিনেই মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় ‘দ্বিতীয় বাবরি মসজিদ’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা ছিল। কিন্তু সেই দিনটি আসার আগেই জমি বিবাদে রণক্ষেত্র হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলো জেলা রাজনীতিতে। একদিকে বিতর্ক এড়াতে প্রস্তাবিত জমি কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দিলেন মালিক, অন্যদিকে তা দেখে মেজাজ হারিয়ে কার্যত যুদ্ধের ডাক দিলেন ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। তিনি সাফ জানালেন, প্রয়োজনে রক্তগঙ্গা বইবে, তবু মসজিদ হবেই। এই পরিস্থিতিতে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন রাজ্যের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আখরুজ্জামান।
বেলডাঙার ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে খাগড়ুপাড়া মোড়ে যে ৬ বিঘা জমিতে মসজিদ হওয়ার কথা ছিল, বৃহস্পতিবার সকালে সেই জমি হঠাৎই ঘিরে দেন জমির মালিক নিজামুদ্দিন চৌধুরী। তিনি বিধায়কের দাবি সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়ে বলেন, “হুমায়ুন কবীরকে আমরা জমি বিক্রি করিনি। ও তো চিটার লোক, মিথ্যে কথা বলছে। আমরা এই বিতর্কিত বাবরি মসজিদ এখানে চাই না। মানুষের আবেগ নিয়ে নাড়াচাড়া করার মানে হয় না।” মালিকপক্ষের দাবি, গায়ের জোরে জমি দখলের চেষ্টা হচ্ছে, যা তাঁরা হতে দেবেন না।
জমির মালিকের এই পদক্ষেপের খবর পেতেই জ্বলে ওঠেন হুমায়ুন কবীর। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি একের পর এক বিস্ফোরক ও উসকানিমূলক মন্তব্য করেন। বিধায়ক বলেন:
“আমি হুমায়ুন কবীর আজ বলছি, বেলডাঙাতে কোনো শক্তিই আমাকে মসজিদ তৈরি করা থেকে আটকাতে পারবে না। আমি চ্যালেঞ্জ করেই বেঁচে আছি। আমি ২০২৪-এ ঘোষণা করেছি এই মসজিদের। কালকে কেন উনি (জমির মালিক) শান্তি-শৃঙ্খলার কথা বলছেন? শান্তি বজায় রাখার দায় কি আমার একার? হোক লড়াই। এই লড়াই করেই দেশ স্বাধীনতা পেয়েছে।”
আবেগের বশে বিধায়ক আরও বলেন, “জেলায় বাবরি মসজিদ হবে। আমি করব। বাবরের পুত্রের নাম হুমায়ুন, আমি ভাগ্যক্রমে হুমায়ুন কবীর। আমিই বাবরি মসজিদ করব। মুর্শিদাবাদে ৭২ শতাংশ মুসলমান, রাজ্যে ৩৭ শতাংশ। বাধা দিলে লড়াই হবে, কেউ আক্রমণ করলে পাল্টা আক্রমণ হবে। আমি সহ একশো জন শহিদ হলে পাঁচশো জনকে শহিদ করব। কিন্তু বাবরি মসজিদ এখানে হবেই।”
তৃণমূল বিধায়কের এমন আগ্রাসী মন্তব্যে অস্বস্তিতে পড়েছে শাসকদল। এ বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন রাজ্যের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আখরুজ্জামান। তিনি হুমায়ুন কবীরের নাম না করে এই উদ্যোগকে ‘রাজনৈতিক স্টান্ট’ বলে অভিহিত করেন। মন্ত্রী বলেন:
“এটা আমাদের কাছে কাম্য নয়। আমরা ধর্মপ্রাণ মানুষ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান আমরা এখানে সম্প্রীতির সঙ্গে বাস করি। কিন্তু যেভাবে একটা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ধর্মকে টানা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। মসজিদ বা মন্দির গড়ার জন্য ঢাকঢোল পেটানোর দরকার হয় না। যার যেখানে প্রয়োজন, সে সেখানে ধর্ম পালন করবে। এটা রাজনৈতিক মুনাফা লোটার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।”
আর মাত্র কয়েক দিন বাকি ৬ ডিসেম্বরের। তার আগেই যেভাবে জমি ঘিরে দেওয়া এবং বিধায়কের ‘পাঁচশো মারার’ হুমকি সামনে এল, তাতে বেলডাঙার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। একদিকে অনড় জমির মালিক, অন্যদিকে ‘শহিদ’ হওয়ার ডাক দেওয়া বিধায়ক এই দুইয়ের মাঝে প্রশাসন কী ভূমিকা নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা জেলা।