“থানার ইট খুলে নেব!”-নতুন দল গড়ে মমতা ও শুভেন্দুকে বেনজির চ্যালেঞ্জ হুমায়ুন কবীরের

নিজস্ব সংবাদদাতা, বেলডাঙা ও মুর্শিদাবাদ:

সাসপেন্ড হওয়ার মাত্র ১৮ দিনের মাথায় নিজের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করলেন হুমায়ুন কবীর। সোমবার বেলডাঙার রেজিনগরে ৫০ বিঘা জমির ওপর তৈরি হওয়া বিশালাকার মঞ্চ থেকে তিনি আত্মপ্রকাশ ঘটালেন তাঁর নতুন দল ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’-র। সভার শুরুতেই তিনি পুলিশের উদ্দেশে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “কোনও থানা যদি আমার নামে মিথ্যা মামলা করে, তবে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সেই থানার ইট খুলে নেব! আমি হুমায়ুন কবীর, আমাকে রোখার সাধ্য কারও নেই।”

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে হুমায়ুন কবীর বলেন, “আপনি আমাকে গদ্দার বলছেন? সাহস থাকলে আমার সামনে এসে বসুন। বাংলার মানুষকে যে মিথ্যাচার শোনান, সেদিন সব ফাঁস করে দেব। আপনি মানুষকে শুধু ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ করতে জানেন।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, মুর্শিদাবাদের স্থানীয় কিছু নেতার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে দল থেকে বের করা হয়েছে। হুমায়ুনের হুঙ্কার, ২০২৬-এর ভোটে মুর্শিদাবাদে জোড়া ফুলকে শূন্য করব। জিরো, জিরো, জিরো!”

এদিন হুমায়ুনের নিশানায় ছিলেন পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। ফিরহাদকে ‘আধা মুসলমান’ বলে কটাক্ষ করে হুমায়ুন বলেন, “ওঁর মা হিন্দু ছিলেন, তাই উনি পূর্ণ মুসলমান নন। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি কেন মসজিদ বানাচ্ছি? আপনি মুসলমানদের মূর্খ ভাববেন না।” শুভেন্দুর ‘মুসলিম বিধায়কদের চ্যাংদোলা করার’ মন্তব্যের প্রেক্ষিতে হুমায়ুন বলেন, “শুভেন্দুকে বলছি, আমার ১০০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩০ জন হিন্দু থাকবে। দেখি আপনি কত বড় পালোয়ান, কাকে চ্যাংদোলা করেন!”

দল ঘোষণার দিনই এক বড়সড় চমক দেন হুমায়ুন। তিনি জানান, সুন্দরবন এডুকেশনাল ট্রাস্ট’ তাঁর নতুন দলের তহবিলে ৩৫ কোটি টাকা দান করেছে। এই বিপুল অর্থ নিয়ে তিনি সারা রাজ্যে সংগঠন বাড়ানোর কাজ শুরু করবেন। একইসঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, আগামী ৩১শে জানুয়ারির মধ্যে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে একটি ঐতিহাসিক জনসভা করবেন তিনি, যেখান থেকে তৃণমূলের ‘রাজনৈতিক মৃত্যুঘণ্টা’ বাজানো হবে।

নিজের নামকে ‘ভাগ্যবান’ (Lucky) বলে দাবি করে হুমায়ুন কবীর প্রার্থী তালিকায় এক অদ্ভুত সমীকরণ নিয়ে এসেছেন। তাঁর দল থেকে চারজন ‘হুমায়ুন কবীর’ বিভিন্ন কেন্দ্রে লড়বেন।

এদিনের সভার সবচেয়ে বড় চমক ছিল প্রার্থী তালিকা। শুধু দলনেতা নন, তাঁর দলে আরও তিন জন ‘হুমায়ুন কবীর’ বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। দলনেতা নিজে লড়বেন দুটি আসন থেকে। অন্যদিকে রানিনগর থেকে বিশিষ্ট চিকিৎসক তথা ২০১৬ সালের প্রাক্তন তৃণমূল প্রার্থী ডাঃ হুমায়ুন কবীর, ভগবানগোলা থেকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবীর এবং রামপুরহাট থেকে পাথর খাদানের মালিক হুমায়ুন কবীর লড়বেন বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। সংগঠনের বিস্তারে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সভাপতি হিসেবে হাজি ইব্রার হোসেনকে খড়্গপুর গ্রামীণের প্রার্থী করা হয়েছে এবং কলকাতার হাই-প্রোফাইল বালিগঞ্জ কেন্দ্রে নাম ঘোষণা করা হয়েছে নিশা চট্টোপাধ্যায়ের। এছাড়াও মুর্শিদাবাদ (৬৪) আসনে লড়বেন প্রাক্তন তৃণমূল নেত্রী মনীষা পাণ্ডে, মালদহের বৈষ্ণবনগরে মুস্তারা বিবি, দক্ষিণ দিনাজপুরের ধনিরামে চিকিৎসক ডঃ ওয়েদুল রহমান এবং ইছাপুর কেন্দ্রে পুরনো তৃণমূল লড়াকু সৈনিক সিরাজুল মন্ডল। এই বৈচিত্র্যময় তালিকার মাধ্যমে হুমায়ুন কবীর বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর দল কেবল নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা বাংলা জুড়েই লড়তে প্রস্তুত।

হুমায়ুন মনে করিয়ে দেন তাঁর বাড়িতে একসময় সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় ও প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বরা আসতেন। তিনি অধীর চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর পুরনো সম্পর্কের কথাও বলেন, যদিও দাবি করেন যে অধীরের পরিবারের সদস্যদের ‘বর্ণবিদ্বেষী’ মন্তব্যের কারণেই তিনি কংগ্রেস ছেড়েছিলেন। তাঁর কথায়, “আমি অঙ্ক কষে চলি। ২০২৬-এ ৯০টি আসন জিতে আমিই কিং-মেকার হব।”

এদিন মঞ্চে উন্মোচন করা হয় ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’-র পতাকা ও ইস্তেহার। দলের পতাকায় তিনটি রং—হলুদ, সবুজ ও সাদা। হুমায়ুন কবীর নিজেকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন। পাশাপাশি রাজ্য কমিটির কাঠামোও তুলে ধরেন তিনি। হাসনাত আলি, প্রকাশ রঞ্জন শ্রীবাস্তব সহ ১৩ জন ভাইস প্রেসিডেন্ট। জানা গেছে, ৭৫ জনের বদলে দেড়শো সদস্যের রাজ্য কমিটি গঠন করা হয়েছে।

হুমায়ুন কবীরের এই নতুন দল ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’ আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে যে বড়সড় থাবা বসাবে, তা সভার ভিড় দেখলেই স্পষ্ট হয়। ব্রিগেডে সভা করে তিনি কতটা শক্তি প্রদর্শন করতে পারেন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *