‘চোর জেলা পরিষদের অংশীদার থাকব না’, বিস্ফোরক পোস্ট করে ইস্তফা শাহনাজ বেগমের

নিউজ ফ্রন্ট, মুর্শিদাবাদ: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে মুর্শিদাবাদ জেলা রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। দলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ, জেলা পরিষদের প্রাক্তন সহকারী সভাধিপতি তথা দাপুটে নেত্রী শাহনাজ বেগম জেলা পরিষদের সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দিলেন। তবে তাঁর এই ইস্তফার চেয়েও রাজনৈতিক মহলে বেশি শোরগোল ফেলেছে তাঁর বিস্ফোরক ফেসবুক পোস্ট এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি জেহাদ ঘোষণা।

ফেসবুকে ‘বোমা’ ফাটালেন শাহনাজ গত ১৭ ডিসেম্বর শাহনাজ বেগম তাঁর পদত্যাগপত্র বিভাগীয় কমিশনারের কাছে পাঠান। এরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন “চোর জেলা পরিষদের একজন অংশীদার হয়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আপনাদের দেওয়া টার্ম পূর্ণ হওয়ার আগেই আমি সদস্য পদ ত্যাগ করতে বাধ্য হলাম।”

তিনি আরও স্পষ্ট করে দেন যে, সারাজীবন অন্যায়ের সাথে আপস করেননি এবং আগামীতেও দুর্নীতির ভাগীদার হবেন না। জেলা পরিষদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় সহকর্মীদের আবেগঘন বার্তাও দেন তিনি।

দুর্নীতির খতিয়ান ও ‘কাটমানি’র অভিযোগ পদত্যাগের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শাহনাজ বেগম সরাসরি আঙুল তুলেছেন বর্তমান সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানার দিকে। তাঁর অভিযোগ জেলা পরিষদ বর্তমানে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রমাণের ভিত্তিতে তিনি অনেক আগে থেকেই প্রশাসনিক স্তরে অভিযোগ জানিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমসিইটি (MCET) কলেজ এবং আরএনটেগোর (RN Tagore) হাসপাতাল কোনো এক বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে ‘কাটমানি’ খাওয়ার চক্রান্ত চলছে বলে তিনি বিস্ফোরক দাবি করেছেন। শাহনাজ জানান, তাঁর নির্বাচনী এলাকার (শক্তিপুর ও সংলগ্ন এলাকা) মানুষের সাথে আলোচনার পরেই তিনি এই ‘চোরের তকমা’ থেকে মুক্তি পেতে পদত্যাগ করেছেন।

মুর্শিদাবাদে তৃণমূলের ‘কারিগর’ ছিলেন শাহনাজ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শাহনাজ বেগমের চলে যাওয়া তৃণমূলের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। একসময় কংগ্রেসের দুর্ভেদ্য দুর্গ মুর্শিদাবাদে কংগ্রেস ভেঙে জেলা পরিষদ তৃণমূলের দখলে আনার নেপথ্যে মূল কারিগর বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন তিনি। ২০১৩ সাল থেকে সোমপাড়া, রামপাড়া ও রামনগর বাছড়া এলাকার মানুষ তাঁকে টানা তিনবার বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আসন্ন ২০২৬ নির্বাচনে ভোটব্যাঙ্কেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরবর্তী গন্তব্য কী? হুমায়ুন-যোগের জল্পনা ইস্তফা দেওয়ার পর শাহনাজ বেগম জানিয়েছেন, তিনি এখনই বসে থাকবেন না। বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের সাথে তাঁর ফোনে কথা হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন তিনি। তবে তিনি কোনো নতুন রাজনৈতিক দলে যোগ দেবেন নাকি অরাজনৈতিক সংগঠন করবেন, তা নিয়ে রহস্য বজায় রেখেছেন।

পাল্টা সাফাই সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানার শাহনাজ বেগমের এই আক্রমণাত্মক ইস্তফাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ জেলা পরিষদের সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানা। তিনি বলেন

কে পদত্যাগ করল তা নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। দল প্রতিটি সদস্যের নিষ্ঠা ও লক্ষ্য বিচার করে। সভাধিপতির পদে থাকলে অনেক অভিযোগ শুনতে হয়, কিন্তু প্রমাণের অভাব থাকে। আমি সবাইকে নিয়ে টিম হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করি। মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদ একটি স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, যা প্রশাসন ও রাজ্য সরকার জানে। উনি বয়সে বড়, আমি তাঁকে সম্মান করি, কিন্তু দলের চেয়ে বড় কেউ নন।”

দল কি পারতো না এই বিপর্যয় আটকাতে! এমনিতেই হুমায়ুনকে সাসপেন্ড করায় এই মুহূর্তে দল কিছুটা ব্যাকফুটে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী জেলায় আসার আগে তিনি একটা খোলা চিঠি লিখেছিলেন দুর্নীতি নিয়ে তখন থেকেই জেলা নেতৃত্ব সাহানাজ প্রসঙ্গ টি বারবার এড়িয়ে গেছেন। দলেরই একটা অংশ চাইছিল এই দুর্নীতি ঢাকতে। এই প্রসঙ্গে বহরমপুর মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি অপূর্ব সরকার বলেন “সব কিছু সব যায়গায় বলা যায় না এই সব বলার দলে একটা জায়গা আছে সেখানে বলতে হয়।“ তাঁর দল ছাড়া নিয়ে কোন মন্তব্য করতে চাননি দলের জেলার চেয়ারম্যান বিধায়ক নিয়ামত সেখ।  

রাজনৈতিক প্রভাব শাহনাজ বেগমের মতো এক জনপ্রিয় সংগঠক যখন সরাসরি ‘চোর’ অপবাদ দিয়ে দল ছাড়েন, তখন বিরোধী দল কংগ্রেস ও বিজেপি একে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে পঞ্চায়েত ও জেলা পরিষদের কাজ নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে উসকে দিতে শাহনাজের এই ফেসবুক পোস্ট অক্সিজেন জোগাবে বিরোধীদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *