দেশে ‘মব লিঞ্চিং’ আইনে দ্বিতীয় নজির
নিউজ ফ্রন্ট, জঙ্গিপুর ও কলকাতা:
মুর্শিদাবাদের সামসেরগঞ্জে বাবা ও ছেলেকে বাড়ি থেকে টেনে বের করে নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুনের ঘটনায় নজিরবিহীন রায় দিল আদালত। মঙ্গলবার জঙ্গিপুর মহকুমা আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক অমিতাভ মুখোপাধ্যায় এই মামলায় ধৃত ১৩ জনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে মৃত হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর ছেলে চন্দন দাসের পরিবারকে ১৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের নতুন ফৌজদারি বিধি ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) ১০৩(২) ধারায় ‘মব লিঞ্চিং’ বা গণপিটুনিতে মৃত্যু সংক্রান্ত অপরাধে এটি দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো সাজা ঘোষণার ঘটনা।
রক্তঝরা ১২ই এপ্রিল: ফিরে দেখা সেই নারকীয় ঘটনা
চলতি বছরের ১২ এপ্রিল ওয়াকফ আইনের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে সামসেরগঞ্জের জাফরাবাদ গ্রাম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ, সেই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একদল উন্মত্ত জনতা জাফরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা হরগোবিন্দ দাস এবং তাঁর ছেলে চন্দন দাসের বাড়িতে চড়াও হয়। তাঁদের ঘর থেকে টেনে বের করে এনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে খুন করা হয়। এই ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।
এই মামলার কিনারা করতে ডিআইজি (মুর্শিদাবাদ রেঞ্জ) সৈয়দ ওয়াকার রাজার নেতৃত্বে একটি স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (SIT) গঠন করা হয়েছিল। এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ) সুপ্রতিম সরকার এদিন সংবাদিক সম্মেলনে জানান, পুলিশ আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অপরাধীদের কোণঠাসা করেছে:
- গেইট প্যাটার্ন বিশ্লেষণ (Gait Pattern Analysis): সিসিটিভি ফুটেজে থাকা ব্যক্তিদের হাঁটার ধরন বা শারীরিক ভঙ্গির সাথে ধৃতদের হাঁটার ধরন ফরেনসিক ল্যাবে মিলিয়ে দেখা হয়েছে, যা অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে।
- সিডিআর ও গুগল ম্যাপ প্লটিং: অভিযুক্তদের মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন সংগ্রহ করে গুগল ম্যাপে প্লট করা হয়েছে, যা প্রমাণ করেছে খুনের সময় তারা ঠিক কোথায় উপস্থিত ছিল।
- ডিএনএ প্রোফাইলিং: উদ্ধার হওয়া রক্তমাখা অস্ত্রের ডিএনএ এবং মৃতদের ডিএনএ হুবহু মিলে গিয়েছে।
এডিজি আরও জানান, এই খুনের নেপথ্যে কেবল তৎকালীন পরিস্থিতি নয়, বরং পুরানো জমি বিবাদ এবং ব্যক্তিগত শত্রুতা কাজ করেছিল।
আইনি লড়াই: ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ মামলা
সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় জানান, পুলিশ মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় ৯৮৩ পাতার চার্জশিট জমা দিয়েছিল। ৩৮ জন সাক্ষীর বয়ান নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের কাছে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড—দুটি বিকল্প ছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান নির্দেশিকা মৃত্যুদণ্ডকে নিরুৎসাহিত করায় এবং আসামিদের পারিবারিক অবস্থা বিবেচনা করে বিচারক যাবজ্জীবনের রায় দিয়েছেন।” ডাকাতি ও লুঠপাটের জন্য মূল সাজার সাথে আরও ১০ বছরের অতিরিক্ত কারাদণ্ড যোগ করা হয়েছে।
আদালত যাদের যাবজ্জীবন দিয়েছে তারা হলো: দিলদার নদাব, আসমাউল নদাব ওরফে কালু, এনজামুল হক ওরফে বাবলু, জিয়াউল হক, ফেকারুল সেখ ওরফে মহক, আজফারুল সেখ ওরফে বিলাই, মনিরুল সেখ ওরফে মনি, একবাল সেখ, নুরুল ইসলাম, সাবা করিম, হযরত সেখ ওরফে হযরত আলী, আকবর আলী ওরফে একবর সেখ এবং ইউসুফ সেখ। যদিও আসামিরা আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে নিজেদের নির্দোষ এবং ‘ষড়যন্ত্রের শিকার’ বলে দাবি করেছে।
সরব বিরোধী দলনেতা: মমতাকে তীব্র আক্রমণ
আদালতের এই রায়কে পুরোপুরি স্বাগত জানাতে পারেননি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি নিহতের পরিবারের ফাঁসির দাবির পাশে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাজ্য পুলিশকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। শুভেন্দুর তোপ, “পুলিশ এমনভাবে কেস সাজিয়েছে যাতে ফাঁসি না হয়। পশু কাটার অস্ত্র দিয়ে যারা মানুষকে টুকরো টুকরো করে কাটল, তাদের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চোরকে বলেন চুরি করতে আর গৃহস্থকে বলেন সাবধান থাকতে। আমরা এই পরিবারকে আইনি লড়াইয়ে সাহায্য করব যাতে তারা উচ্চ আদালতে গিয়ে ফাঁসির সাজা নিশ্চিত করতে পারে।”
মাত্র ৮ মাস ১০ দিনের মধ্যে এই ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নজির গড়ল জঙ্গিপুর আদালত ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। তবে রাজনৈতিক তরজা এবং সাজার পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক এখনও মুর্শিদাবাদের বাতাসে ভাসছে।