নিউজ ফ্রন্ট, বহরমপুর, অক্টোবর ২১
ইতিহাস, সংস্কৃতি আর আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধনে এবারের কালীপুজোয় অনন্য নজির স্থাপন করেছে বহরমপুরের জজ কোর্ট মোড়ের সান্টাফোকিয়া পুজো কমিটি। দেখতে দেখতে এই পুজো ৪৮ তম বর্ষে পা দিল এই বছর। এবারের থিম “সিপাহী বিদ্রোহ ও শক্তির আরাধনা”। যেই বিদ্রোহের প্রথম আগুন জ্বলে উঠেছিল এই বহরমপুরের মাটিতেই, ১৮৫৭ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারিতে।

পুজোর মূল ভাবনা ও পরিকল্পনা এসেছে কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীর দূরদর্শী চিন্তা ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তাঁর কথায়, “যে জাতি নিজের ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করতে শেখে না, সে নিজের ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে পারে না।”
এই ভাবনাতেই পুজোর মণ্ডপে তৈরি হচ্ছে এক জীবন্ত ইতিহাস ব্যারাক স্কোয়ারের প্রতিরূপ। মণ্ডপে প্রবেশ করলেই দর্শক যেন ফিরে যাবেন ১৮৫৭ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে, যখন বহরমপুর ব্যারাকের ভারতীয় সেনারা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। নতুন রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শুকরের চর্বি ব্যবহারের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিবাদই ছড়িয়ে দেয় স্বাধীনতার প্রথম স্ফুলিঙ্গ।

মণ্ডপের কেন্দ্রে থাকবে মা কালীর জাগ্রত রূপ হাতে খড়্গ, পদতলে অশুভ শক্তির প্রতীক। চারপাশে ফুটে উঠবে সিপাহীদের সাহস, ত্যাগ ও বিদ্রোহের দৃশ্যচিত্র। শিল্পীরা নিখুঁত কারিগরিতে ফুটিয়ে তুলেছেন ইতিহাসের সেই রণক্ষেত্র, যেখানে প্রতিবাদ ছিল ভক্তিরই এক রূপ।
এই কালীপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি এক চেতনার নবজাগরণ অধীর রঞ্জন চৌধুরী চান, এই পুজোর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম জানুক যে ভারতের স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল এই বহরমপুরের মাটিতেই। তিনি বলেন, “মা কালী আমাদের শেখান ভয় নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই প্রকৃত ধর্ম। এই পুজো সেই চেতনার প্রতীক যেখানে ভক্তি মানে অন্ধ আনুগত্য নয়, ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা।”

পুজো কমিটির সদস্যদের মতে, এই আয়োজন শুধু দেবীর আরাধনা নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের প্রতীক। সিপাহী বিদ্রোহের বীর সেনানিরা ছিলেন সেই কালোত্তীর্ণ শক্তির মানবরূপ যাঁরা মৃত্যুকে বরণ করেও সত্যের পথ থেকে সরে আসেননি।
মণ্ডপের ভেতরে থাকবে আলোক ও শব্দ প্রক্ষেপণের মাধ্যমে ইতিহাসের দৃশ্যপট, যেখানে দেখা যাবে সিপাহীদের বিদ্রোহ, বহরমপুর ব্যারাকের উত্তাল মুহূর্ত, এবং শেষে মা কালীর আবির্ভাব যা বোঝাবে “অশুভের বিনাশ ও সত্যের জয়।”

বহরমপুরের জজ কোর্ট মোড়ের কালীপুজো তাই এক অনন্য বার্তা দিচ্ছে “অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই প্রকৃত ধর্ম, আর শক্তির আরাধনাই স্বাধীনতার পথ।”
ইতিহাস, দেশপ্রেম ও আধ্যাত্মিকতার এই মিলনে বহরমপুরের এই পুজো আজ সমগ্র বাংলার এক নতুন চেতনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।