নিউজ ফ্রন্ট, নয়াদিল্লি, ১৩ অক্টোবর: শিশুমৃত্যুর বিভীষিকা ঘিরে ফের নড়েচড়ে বসল কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা। চেন্নাইয়ে একাধিক স্থানে আজ হানা দিল ইডি (ED)। কোল্ডরিফ (Coldrif) কফ সিরাপ থেকে ২২ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত শ্রীসন ফার্মা (Sresan Pharmaceuticals)-এর সঙ্গে যুক্ত মোট সাতটি স্থানে তল্লাশি চালাচ্ছে সংস্থা। সূত্রের খবর, এই তল্লাশি চলছে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন (PMLA)-এর অধীনে।
ইডির এই অভিযান তামিলনাড়ুর ফুড অ্যান্ড ড্রাগ কন্ট্রোল অফিস (TNFDA)-এর শীর্ষ কর্তাদের ঘরেও চলছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও শ্রীসন ফার্মাকে কার্যত ছাড়পত্র দিয়ে রাখা হয়েছিল।
মধ্যপ্রদেশের ছিন্দওয়ারা জেলায় ৫ বছরের নিচে অন্তত ২২টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে কোল্ডরিফ কফ সিরাপ সেবনের পর। এই সিরাপে ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল (DEG) নামে এক বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে, যা শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি বিকল করে দিতে পারে এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে। রাজস্থানের কিছু অংশেও অনুরূপ মৃত্যুর ঘটনা ধরা পড়েছে। শ্রীসন ফার্মার মালিক জি. রঙ্গনাথন-কে ইতিমধ্যেই ৯ অক্টোবর মধ্যপ্রদেশ পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

২০১১ সালে তামিলনাড়ু ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (TNFDA) থেকে লাইসেন্স পায় শ্রীসন ফার্মা। কিন্তু সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (CDSCO)-এর সাম্প্রতিক পরিদর্শনে ধরা পড়েছে চমকপ্রদ অনিয়ম। তদন্তে দেখা গেছে, সংস্থাটি কখনওই গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিসেস (GMP)-এর নিয়ম মেনে চলেনি। উৎপাদন ইউনিটে ছিল অস্বাস্থ্যকর অবস্থা, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও ছিল শোচনীয়। এছাড়া সংস্থাটি ‘সুগম’ পোর্টালে নিজেদের উৎপাদিত ওষুধের তথ্য নিবন্ধন করেনি যা ভারতের প্রতিটি ওষুধ প্রস্তুতকারকের জন্য বাধ্যতামূলক। ফলে সংস্থাটি কার্যত কেন্দ্রীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নজর এড়িয়ে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে অবাধে ওষুধ তৈরি করে এসেছে।
ঘটনার পর মধ্যপ্রদেশ সরকার দুইজন ড্রাগ ইন্সপেক্টর ও এক ডেপুটি ডিরেক্টরকে সাসপেন্ড করেছে। রাজ্যের ড্রাগ কন্ট্রোলারকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ছিন্দওয়ারা জেলার এক চিকিৎসককে অবহেলার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তামিলনাড়ু সরকারও পিছু হটেনি রাজ্যের দুই সিনিয়র ওষুধ পরিদর্শককে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং শ্রীসন ফার্মাকে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইডির তদন্ত এখন কেন্দ্রীভূত হয়েছে অর্থ লেনদেন ও প্রভাব-খাটানো চক্রে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, লাইসেন্স ও মান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত অনিয়ম ঢাকতে সংস্থাটি স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তাদের প্রভাবিত করেছিল। ইডি এই সংক্রান্ত ব্যাংক রেকর্ড, নথি ও ইমেল যোগাযোগ খতিয়ে দেখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কাণ্ড শুধু ওষুধ তৈরির অনিয়ম নয়, বরং ভারতের ফার্মা সেক্টরের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর গুরুতর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। এই ঘটনার জেরে দেশজুড়ে শিশুদের ওষুধের মান নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। কেন্দ্র ইতিমধ্যেই সমস্ত রাজ্যকে শিশুদের ব্যবহৃত কফ সিরাপগুলির জরুরি গুণমান পরীক্ষা ও রিকল প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে। চলমান তদন্তে ইডির পরবর্তী পদক্ষেপে এখন সবার চোখ। যদি শ্রীসন ফার্মা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে আর্থিক লেনদেন বা যোগসাজশের প্রমাণ মেলে, তবে এই কফ সিরাপ কাণ্ড ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় ফার্মা-দুর্নীতি মামলায় রূপ নিতে পারে।